যশোরের চৌগাছায় জাতীয়ফল কাঁঠালের বাম্পার ফলন হলেও দাম পাচ্ছেনা কৃষকরা। স্থানীয় ব্যাপারীদের হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষক বাগানের গাছ থেকে কাঁঠাল পাড়ছে না। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাযায় চলতি মৌসুমে উপজেলায় খাজা, দুদরাজ, গোপালবোগী, রাজভোগ, হাজারি, রশা, লাটিম ও জামায়ভোগী জাতের প্রায় ৭ থেকে ৮’শ বিঘা জমিতে কাঁঠাল চাষ রয়েছে। ফলনও বেশ ভাল হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত কাঁঠালের বাজারে দাম পড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনেও সরকার বিদেশে কাঁঠালের বাজার সৃষ্টি করতে না পারায় সম্ভাবনাময় একটি কৃষিখাত ধ্বংস হতে চলেছে।
শুক্রবার সরেজমিনে উপজেলার কাঁঠালের বড় বাজারে গেলে কথা হয় উপজেলার সাঞ্চাডাঙ্গা গ্রামের কাঁঠাল চাষী সামাউল ইসলাম, হাফিজুর রহমান, দিঘড়ী গ্রামের বজলুর রহমান, হাজরাখানা গ্রামের আনছার আলী, লিয়াকত আলী, চাঁদপাড়া গ্রামের শহীদ হোসেন, কুরমান আলী ও মাধবপুর গ্রামের ওমর আলীর সাথে। তারা জানান এ বছর কাঁঠালের ফলন খুবই ভাল হয়েছে তবে বাজারে দাম একেবারেই কম। পেটভরা গ্রামের আজিজুর রহমান জানান এ বছর যেখানে আমার কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি হওয়ার কথা সেখানে ২০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। লোকসানের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান কাঁঠাল আগের মত বিনা চর্চায় এখন আর হয় না সার-সেচ দিতে হয় পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরী ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলেকাঁঠালের উৎপাদন খরচ অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুন। অপরদিকে বাজারে কাঁঠালের দাম বাড়াতো দুরের কথা ব্যাপারীরা কাঁঠাল কিনছেন না। যেখানে গত বছর ঢাকার বাজারে ১শ কাঁঠালের দাম ছিল ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেখানে এ বছর ১শ কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। এছাড়া গত বছর চৌগাছা থেকে ঢাকায় কাঁঠাল নিয়ে যেতে ট্রাক প্রতি ভাড়া দিতে হতো ৮ হাজার টাকা কিন্তু এ বছর ভাড়া দিতে হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। স্থানীয় কাঁঠালের ব্যাপারী রেজাউল ইসলাম, বুদো রহমান, ইমরাম হোসেন, আকবার আলী, নাসির উদ্দীন, আমির হোসেন, তোতা মিয়া জানান বর্তমানে কাঁঠালের দাম ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় আজকের বাজারে আমাদের ৫/৭ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এ সময় কথা হয় চৌগাছা বাজারে কাঁঠাল বিক্রি করতে আসা আব্দুল্লাহ-আল মামুন, শেখ সাদী, আশারাফুল ইসলাম, বাবু রহমান, কবির হোসেন, হাফিজুর রহমান ও আব্দুল জলিল তারা জানান এ বছর কাঁঠালে অনেক টাকা লোকসান হচ্ছে। তারা সকলে জানান বিগত কয়েক বছর যাবৎ কাঁঠাল বিক্রি করে তারা লাভবান হচ্ছিল কিন্তু এবছর ভাল ফলন হওয়া স্বত্বেও কাঁঠালের দাম পড়ে যাওয়ায় ব্যাপকহারে লোকসান হচ্ছে। চৌগাছা বাজারে কাঁঠাল কিনতে আসা বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের হাবিবুর রহমান ও মকবুল খান জানান গত বছর কাঁঠালের দাম ভাল পাওয়ায় এ বছর প্রথম দিকে বেশি বেশি কাঁঠাল ক্রয় করেছি। ট্রাক-ট্রাক কাঁঠাল কিনে লাভতো দুরের কথা এ বছর অনেক লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে যশোরের সাতমাইল কাঁঠাল হাট থেকে ৫ ট্রাক কাঁঠাল কিনে ৫০/৬০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। আজ চৌগাছা বাজার থেকে বেশি কাঁঠাল কিনতে চাচ্ছিনা।
চৌগাছা বাজারে কাঁঠাল বিক্রি করতে আসা কৃষকরা আরো জানান বড় বড় ব্যাপারীরা কাঁঠাল বাগানে গিয়ে বাগান ধরে কিনছে না। বাজারে আনলে দবিয়ে-চটকিয়ে কমদাম বলছে। যাতে কাঁঠাল বিক্রি করে শ্রমিকদের মুজুরী ও বহন খরচ বাদ দিলে কিছুই থাকছে না। অনেক কাঁঠাল চাষী জানান কয়েক বছর যাবৎ ধান-পাটের দাম না পেয়ে বিকল্প হিসেবে কাঁঠাল চাষের দিকে জোর দিয়েছিলাম কিন্তু এবছর যে পরিমান লোকসান হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যাবে। অনেক কাঁঠাল চাষী আরো জানান ধার দেনা করে দোকান-পাটের হালখাতা ও ব্যাংক বিমার টাকা পরিশোধ করেছি কাঁঠাল বিক্রি করে তা পরিশোধ করবো তাই। কিন্তু সে আশার গুড়ে-বালী ভ্যান নসিমন ও আলমসাধু বোঝায় করে বাজারে কাঁঠাল নিয়ে এসে গাড়ী ভাড়া আর শ্রমিক খরচ উঠছে না। এখন আমরা কিভাবে ধার দেনা শোধ করব তার কোন পথ পাচ্ছিনা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দীন বলেন কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল ফলের রাজা ও একটি অত্যান্ত সুস্বাদু ফল সরকার এটিকে হিমাগারে রক্ষাবেক্ষণ ও বিদেশে বাজার সৃষ্টির চেষ্টা করলে অবশ্যই সফল হতো। আর সে ক্ষেত্রে কাঁঠাল চাষ হতো দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কৃষি খাত।