নদ-নদী বিধৌত বাংলাদেশকে বলা হয়- নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশের মাটির মতোই এদেশের নদ-নদী অনবরত তাদের স্রোতধারাগুলি পরিবর্তিত করে সময়ে সময়ে অনেক সভ্যতা গড়ে তুলেছে। আবার সময়ে সময়ে ধ্বংসের তাণ্ডবে লাখো মানুষকে করেছে সর্বহারা। কাজেই নদ-নদীর স্রোতধারার সাথে বাংলাদেশের সভ্যতা, মানুষের জীবনধারা ও অর্থনৈতিক বিষয়সহ অনেক কিছুই জড়িত।
নদী ভাঙন এদেশের অন্যতম বড় দুর্যোগ
নদী ভাঙন আমাদের দেশে একটি অতি প্রাচীন ও ভয়াবহ সমস্যা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দেশে বন্যাকে দুর্যোগ হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেয়া হলেও, কৃষিজীবী সাধারণ মানুষের কাছে নদী ভাঙন হচ্ছে এক নম্বর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যা বছরের বারো মাসই ধরে নানা গতিতে চলে-আর রেখে যায় দীর্ঘমেয়াদী ছাপ।
কিন্তু ভাঙন রোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পদক্ষেপ গ্রহনে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নদী ভাঙনে প্রতিবছর গৃহহীন উদ্বান্তু লোকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি সরকারের কোটি কোটি টাকাও মিশে যাচ্ছে নদীর জলে। নদী ভাঙন এদেশের একটি বড় ধরনের দুর্যোগ হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে নদী ভাঙন সমস্যাকে জাতীয় দুর্যোগ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের মোট আয়তনের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই নদ-নদী অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। দেশের অন্যতম নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, বংশী, ডাকাতিয়া, কীর্তনখোলা, কর্ণফুলী, কুমার, কুশিয়ারা, সুরমা, তিস্তা, ঘাঘট, কংস, মাতামুহরী, সাঙ্গু, যমুনেশ্বরী, চিত্রা, গড়াই, দুধকুমার, মহানন্দা, করতোয়া ছাড়াও নদী বিধৌত বাংলাদেশের ছোট বড় নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৩০০টি।
এসব নদ-নদীর তটরেখা যার দৈর্ঘ্য হচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার ১৪ কিলোমিটার। এরমধ্যে কমপক্ষে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার তটরেখা নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব নদ-নদীর ভাঙনে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে; আর এতে করে বাড়ছে আশ্রয়হীন পরিবারের সংখ্যা। বাংলাদেশে নদী ভাঙন প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের মতই বিপজ্জনক হলেও ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের অবস্থা পরিবর্তনে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়নমূলক প্রকল্প একেবারেই নামমাত্র।
ভাঙনের তাণ্ডবলীলা
পুরো বর্ষাকাল জুড়েই চলতে থাকে ভাঙনের তাণ্ডবলীলা। বর্ষা শেষে ভাঙনের প্রকোপ কিছুটা কমলেও সারা বছর জুড়ে তা কমবেশি মাত্রায় চলতে থাকে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব মতে, ভাঙনের কবলে পড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ লোক নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। সে সঙ্গে ২ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে।
বর্তমানে প্রতিবছর নদী ভাঙনে গৃহহীন উদ্বান্তু লোকের সংখ্যা দুই থেকে আড়াই লাখ হারে বাড়ছে। এতে বছরে ৩শ’ থেকে ৫শ’ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইএফআরসিএস) এর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বব ম্যাকরো ২০১৫ সাল নদী ভাঙনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
তার মতে, নদী ভাঙন এ দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে যে কোন দুর্যোগের চেয়ে বেশি মাত্রায় ধ্বংস করছে, কিন্তু এ নিয়ে খুব কম সংখ্যক লোকই মাথা ঘামায়।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশীপ সেন্টার (বিডিপিসি) কর্তৃক এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫১টি জেলায় নদী নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ২শ’ ৭০ একর জমি। জরিপে আরও বলা যায়, নদী ভাঙনে উদ্বাস্তু, গৃহহীন ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর ২ লাখ ৫০ হাজার করে বাড়ছে। এ বিপুলসংখ্যক মানুষ বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত জমি প্রভৃতি স্থানে ভাসমান এবং মানবেতার জীবন-যাপন করছে। এদের মধ্যে বৃহদাংশ হচ্ছে শহরমুখী।
বিশিষ্ট ভূগোলবিদ প্রফেসর কে. মউদুদ ইলাহীর মতে, প্রতিবছর নদী ভাঙন এলাকা থেকে ২০-৩০ শতাংশ বাস্তুহারা জনগোষ্ঠী নিকটবর্তী শহরে এবং বড় শহরে অভিগমন করে থাকে। ঢাকা শহরের বিপুল সংখ্যক বস্তিবাসীর প্রায় ২৫ শতাংশ নদী ভাঙনজনিত কারণে রাজধানী শহরে ছুটে এসেছে (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রতিবেদন)
.jpg)
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে, প্রতিবছর নদী ভাঙনের মাধ্যমে যে বিশাল ভূ-ভাগ প্রকৃতি আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তার মাত্র ১০ ভাগ সে ফেরত দেয় নতুন চার জাগিয়ে। গত ৩০ বছরে এভাবেই নদীর করালগ্রাসে সহায়-সম্পদ হারাতে হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে। যাদের প্রায় তিনভাগের এক ভাগই ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে।
যেসব কারনে ভাঙে নদী
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৫ টি শহর ও বন্দরসহ মোট ২৮৩টি স্থানে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর মারাত্মক ভাঙন দেখা দেয়। নদী ভাঙনের জন্য প্রধানত নদীর ক্ষয়ক্রিয়াই দায়ী। নদীর স্রোতের বেগ যত বেশি হবে এবং যত বেশি কৌণিকভাবে আঘাত করবে, তত বেশি করে নদীর কূল ভাঙবে। তাছাড়া, প্রবল ঢেউ সৃষ্টি করে। ঢেউয়ের আঘাতে নদীর পাড়ের ভিতরের দিকের নরম কাদামাটি ক্ষয় হয়ে ওপরের মাটিসহ ধসে পড়ে। আর এভাবেই নদী ভেঙে নিয়ে যায় মানুষের বসতভিটা, মাথা গোঁজার ঠাঁই, চাষের জমি, গাছ-পালা, দোকানপাট, মসজিদ-মন্দির, স্কুল-কলেজ আর পূর্ব পুরুষের স্মৃতি।
শহরাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় খাল বা নালা দখল করে ফেলায় কিংবা অন্য কোনো কারণে সেগুলো বন্ধ করে ফেলায় বর্ষা মৌসুমে নদীর উপর পানির চাপ অনেক বেড়ে যায়৷ পানির অতিরিক্ত চাপ তখন পাড়ে গিয়ে আঘাত করে। ফলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও যে প্রক্রিয়ায় এবং যে ধরণের দ্রব্য ব্যবহার করে নদীর পাড় মজবুত করতে বলা হয়, দুর্নীতি করতে গিয়ে তা করা সম্ভব হয় না৷ ফলে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তা তেমন সহায়ক হয় না।

উল্লেখিত মনুষ্যসৃষ্ট কারণ ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণেও নদী ভাঙে। পানিচক্রের প্রভাবে নদীর তীব্র স্রোত ভাটার দিকে চলার পাশাপাশি নদীর পাড়ে আঘাত করতে থাকে। পানির এই ক্রমাগত তীব্র আঘাতে নদীতীরবর্তী ভূভাগ ক্ষয় হতে থাকে। এছাড়াও নদী, তার পানির গতিপথে কোনো বাধা পেলে তাতে তীব্র আঘাত করে। নদী গতিপথ বদলাবার সময় যেদিকে গতি বদলায়, সেদিকের পাড়ে বারবার তীব্রগতিতে আঘাত করতে থাকে। সাধারণত উপকূল এলাকা পলিগঠিত হওয়ায়, নরম পলিমাটির স্তর সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ভেঙ্গে পড়ে।
ভাঙন কবলিত এলাকা
বর্ষা মৌসুমে মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, মাদারীপুর, ভোলা, ফেনী, চাঁদপুর ও কুমিল্লাতে নদী ভাঙন দেখা দেয়। সিইজিআইএসের দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ভাঙন প্রবণ নদী হিসেবে এখন চিহ্নিত হচ্ছে যমুনা।
গত বছর কেবল যমুনা নদীর তীরেই ভেঙেছে দুই হাজার ২২১ হেক্টর জমি, তিন হাজার ৫৯৩ কিলোমিটার বাঁধ, ছয় হাজার ৮৪৩ কিলোমিটার সড়ক। ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছয়টি হাটবাজার, দুটি সরকারি অফিস, তিনটি বেসরকারি অফিস, তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। এছাড়াও ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে ৯০ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমি। এর মধ্যে শুধু সিরাজগঞ্জে বিলীন হয়েছে ২২ হাজার ৭৮৪ হেক্টর এলাকা। এ ছাড়া কুড়িগ্রামে ১৮ হাজার ৪৭৯ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৯ হাজার ৩৪৮ হেক্টর, জামালপুরে ১০ হাজার ৬০৮ হেক্টর, বগুড়ায় ১০ হাজার ৯৩৮ হেক্টর, টাঙ্গাইলে ৯ হাজার ১৫০ হেক্টর এবং মানিকগঞ্জে ছয় হাজার ৩৩৫ হেক্টর ভূমি বিলীন হয়েছে।
একইভাবে পদ্মা অববাহিকার বিভিন্ন জেলায় শাখা নদ-নদীগুলোর তীরেই ভেঙেছে ৫৮৩ হেক্টর জমি ও ১৫৯ কিলোমিটার সড়ক। আর এবার ভাঙনের কবলে পড়েছে ৫৫২ হেক্টর জমি ও ৩৭২ কিলোমিটার সড়ক। আর ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে ২৯ হাজার ৮৪১ হেক্টর এলাকা।
পাল্টে গেছে মানিকগঞ্জের মানচিত্র
১৩৭৯ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের মানিকগঞ্জ, যার নদীর দৈর্ঘ্য ২৪১ কিলোমিটার। যমুনার অব্যাহত ভাঙনে বদলে গেছে মানিকগঞ্জের মানচিত্র। সেইসাথে কপাল পুড়েছে হাজার হাজার মানুষের। নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে তারা।
চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই দুর্গম চর শিবালয়, আলোকদিয়া, ত্রিশুরী, মধ্যনগর, পারুরিয়া, লালগোলা এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। এখনো আতংক এলাকাবাসীর চোখেমুখে। এলাকাবাসী জানান, পদ্মা-যমুনা, ইছামতি, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, কান্তাবতী নদীর অবিরাম ভাঙনে মানিকগঞ্জের শিবালয়, হরিরামপুর, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার হাজার হাজার মানুষ আজ নিঃস্ব, রিক্ত। বাপ-দাদার ভিটা তাদের কাছে শুধুই স্মৃতি।
ভাঙনের স্বীকার মানিকগঞ্জে একসময় যারা ছিল এলাকার অবস্থাপন্ন পরিবার, যাদের ছিল বিঘা বিঘা জমি, গোয়ালভরা গরু ভিটেমাটি হারিয়ে তারাই আজ পথের মানুষ। বাস্তুহারা হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
আলোকদিয়া চরের বাসিন্দা নিয়ামত মৃধা আক্ষেপ করে বলেন, বাড়িঘর আগুনে পুড়লে ছাই থাকে, কিন্তু নদীর ভাঙনে কিছুই থাকে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাদশাহ্ ফকির হয়ে যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে নদী ভাঙনে দৌলতপুর উপজেলার বাঁচামারা ও জিয়নপুর ইউনিয়নের প্রায় অর্ধেক আবাদি জমিসহ বিস্তীর্ণ জনপদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ যমুনার গর্ভে চলে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘিওর উপজেলার ইছামতি ও কালীগঙ্গার ভাঙনে শ্রীধরনগর, কুস্তা, কলেজপাড়া, মাইলাগী, জাবরা, বৈকুণ্ঠপুর, তরা প্রভৃতি এলাকা ক্রমেই বিলীন হচ্ছে। এছাড়া শিবালয়ের তেওতা ও আরুয়া ইউনিয়নের সবচেয়ে ভাঙনকবলিত জাফরগঞ্জ বন্দর, ধুবলিয়া, গোয়ারিয়া, মালুচি, কাঁঠালিয়া, নয়াকান্দী, ধুঁতরাবাড়ী, মান্দ্রাখোলা এলাকায় পদ্মা-যমুনার ব্যাপক ভাঙনে গত কয়েক বছরে হাট-বাজার, বাড়ি-ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বহু স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে।

হরিরামপুরের ১৩টির মধ্যে রামকৃষ্ণপুর, লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর, ধুলশুরা ইউনিয়নের অধিকাংশ স্থান প্রায় ৩৫ বছর আগে পদ্মায় বিলীন হয়। উপজেলার কাঞ্চনপুর ও বাল্লা ইউনিয়নের পশ্চিমাংশের বহু গ্রাম ও বিস্তীর্ণ জনপদ প্রতি বছর বিলীন হচ্ছে। এর আগে ভাঙনের মুখে হরিরামপুর উপজেলা পরিষদ ভবন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, রাস্তাঘাট ইত্যাদি প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনা হলেও এর অনেক কিছুই পুনরায় বিলীন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি জানান, এ উপজেলার ৬/৭টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ স্থান পদ্মায় বিলীন হওয়ার পর জেগে ওঠা চরাঞ্চল ও অবশিষ্ট এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে প্রশাসনিক আদেশ-নির্দেশ মেনে আসা হচ্ছে। তবে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।
গত দুই সপ্তাহে ভাঙনে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা, ৮টি গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার গৃহহীন ও ১০০ একর ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।
ভাঙনকবলিত ইউনিয়নগুলো হলো চরকাটারী, বাঁচামারা ও বাঘুটিয়া ইউনিয়ন। সহায়সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ওই সব এলাকার মানুষ। যমুনা পাড়ে হুমকির মুখে পড়েছে ওই সব এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিসসহ শত শত বাড়িঘর ও ফসলি জমি।
নদীভাঙনে ইতোমধ্যে ঐতিহ্যবাহী চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চবিদ্যালয়, চরকাটারী বাজার, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূমি মসজিদ, মাদরাসা ও অর্ধশত বাড়িঘর আবাদি জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার ওই এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ ঘরবাড়ি-জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমির ওপর আশ্রয় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
দৌলতপুর উপজেলার চরবারাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ সমেজ প্রামাণিক। গত ২ যুগে ৮ দফা ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তার ৪০ বিঘা জমি ও ঘরবাড়ি ছিল। এখন কিছুই নেই, সবই যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। ইপিজেড এলাকায় কুলির কাজ করে চলে তার সংসার।
চরকাটারী মন্ডল পাড়ার আবদুল খালেক মন্ডল এ প্রতিবেদককে জানান, নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন শুরু হয়। এবার নিজের বাড়িতে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। চরকাটারী বোর্ডঘর বাজার এলাকার আলমগীর হোসেন জানান, যমুনা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর, জায়গা-জমি নদীতে বিলীন হওয়ায় গরু-ছাগল নিয়ে এখন অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে কোনোমতে থাকছেন।
বাচামরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ জানান, এ এলাকাটির ভাঙন ঠেকাতে সাড়ে ৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরইমধ্যে তার ইউনিয়নের ৩০-৪০ একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যমুনা নদীর করাল গ্রাসে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিদ্যালয়টির এক হাজার ৫০০ ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক তোজা বলেন, এই এলাকার মানুষের মনে নদী ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করে। নদী ভাঙনে সর্বশান্ত হয়ে কিংবা ভাঙনের হুমকির মুখে থাকা বাড়ির মানুষজন মাথা গোজার ঠাঁইটুকু রক্ষা করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলেন, এরই মধ্যে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র পাঠানো হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।






