ইন্দুরকানীতে একটি দিঘি ও দিঘির পাড়ের শতবর্শী একটি রেন্ডি গাছের হঠাৎ কেরামতির গুজবে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক ভিড় জমাচ্ছে। তারা রোগ মুক্তির জন্য দিঘিতে গোসল করছে, পানি পান ও রেন্ডি গাছের ছাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

এলাকার একটি পক্ষ এই কাজকে শিরক ( বড় গুনাহ) ভেবে এটাকে বন্ধ করতে চাইছে। কিন্তু অপরপক্ষ এতে কোনো ক্ষতি নাই বলে আগত লোকদেরকে সহায়তা করছে। এ নিয়ে এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

পুলিশ প্রশাসন আগত দর্শনার্থীদের ঠেকাতে লাঠিপেটা করলেও দর্শনার্থী আসা কোনোভাবেই কমছে না। বিগত দুই সপ্তাহের বেশি এ অবস্থা চললেও এর কোন সুরাহা না হওয়ায় দিঘির পাড় আলিম মাদরাসায় শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ফয়সালার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। এ নিয়ে আজ শনিবার মাদরাসা মাঠে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে এক জরুরী সভা ডাকা হয়েছে।

দিঘি ও গাছের কেরামতির গুজব যেভাবে শুরু

লোক মুখে শোনা যায়, পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার এক নারী স্বপ্নে দেখেন তার বাক প্রতিবন্ধি ছেলেকে ওই দিঘিতে গোসল করালে এবং দিঘির পাড়ের রেন্ডি গাছের ছাল ভিজিয়ে পানি খাওয়ালে ছেলে ভাল হয়ে যাবে। এরপর তিনি এসে তার ছেলেকে ওই দিঘিতে গোসল করান এবং গাছের ছাল তুলে নিয়ে ভিজিয়ে খাওয়ালে ছেলে কথা বলা শুরু করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে লোকজন আসতে থাকে। কিন্ত বাস্তবে ওই মহিলার পরিচয় কেহ দিতে পারেনি।

উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের বাড়ৈখালী গ্রামের দিঘিরপাড় জামেয়া-ই-ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা মাঠ সংলগ্ন ছোট একটি পুকুর। আর পুকুরের পাড়ে ঈদগাহ সংলগ্ন একটি বড় শতবর্ষী রেন্ডি গাছ। পুকুরটি আগে আরো বড় ছিল বলে লোকে এটাকে স্থানীয়রা দিঘি বলে আসছে।

এই দিঘীতে গোসল করলে রোগ-ব্যাধি ভাল হয়ে যায় বলে প্রতিদিনই এখানে মানুষ ভিড় করছে

শুক্রবার দেখা যায় যে, দুর-দুরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সের শত শত নারী পুরুষ ওই দিঘির পানিতে গোসল করছে, পানি পান করছে এবং রেন্ডি গাছের ছাল তুলে নিচ্ছে ভিজিয়ে পানি খাবার জন্য।

দিঘীতে গোসল করতে সপরিবারে ভান্ডারিয়া থেকে এসেছেন উপজেলার চরখালী গ্রামের সেলিম। তিনি জানান, এখানে গোসল করে বিভিন্ন লোকের ভাল হবার কথা শুনে আমরাও এসেছি গোসল করতে।

বাড়ৈখালী গ্রামের ভ্যান চালক মনির হোসন জানায়, তিনি এক্সিডেন্টে কাঁধে ব্যাথা পেয়েছিলেন। দিঘিতে গোসল করার পর তার কাঁধের ব্যথা ভাল হয়েছে। উমেদপর গ্রামের লাইলী বেগম এসেছেন তার নাতনি নুরুন্নাহারকে নিয়ে। তারা দু’জনেই ওই দিঘিতে গোসল করেছেন।

টগড়া গ্রামের নাসির উদ্দিন জানান, তার মেরুদন্ডে ব্যথা ছিল সে ওই দিঘিতে গোসল করায় তার মেরুদন্ডের ব্যথা কমেছে।

ওই দিঘিতে গোসল করেছেন পাড়েরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাহাবউদ্দিন হাওলাদার এবং শাহআলম হাওলাদার।

এলাকার কতিপয় যুবক ও বৃদ্ধরা জানায়, ওই রেন্ডি গাছের কেরামতি আছে। কেহ ভয়ে ওই গাছের ডাল কাটে না। দুই বছর আগে এলাকার একটি খাল কাটার জন্য সাতক্ষীরা থেকে শ্রমিক এসেছিল। তারা ওই গাছ থেকে জ্বালানীর জন্য লাকড়ী কাটতে উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পড়ে দিঘির পানিতে গোসল করানোর পরে আবার সুস্থ হয়ে যায়। তারা আরো বলেন, ওই গাছের ছোট ডালও বেশ শক্ত। প্রমান স্বরূপ তারা ৩টি ছেলেকে গাছের ছোট ডাল ধরে ঝুলে থাকতে বলে দেখান।

দিঘিরপাড় জামে মসজিদের ইমাম ও ওই মাদরাসার শিক্ষক আব্দুস সালাম জানান, আমি দীর্ঘদিন এখানে আছি। দিঘি এবং গাছের কোন কেরামতির কথা আগে শুনিনি। ১৫ দিন ধরে এখানে লোকজন গোসল করতে আসে।

দিঘিরপাড় জামেয়া-ই-ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার সুপার মাওলানা সাইদুল ইসলাম জানান, হঠাৎ দিঘির পানির কেরামতির খবরে প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষ এসে গোসল করায় মাদরাসার শিক্ষার পরিবেশ ব্যহত হচ্ছে। বিষয়টি ফয়সালার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

পাড়েরহাট ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার বাবুল বিষয়টির বিরোধিতা করেন এবং এসব কুসংস্কারের বাঁধা দেন। তিনি জানান, কতিপয় অসৎ প্রকৃতির লোক মাদরাসা ও মসজিদকে অপবিত্র করার জন্য দিঘিকে পুঁজি করে ভূয়া কেরামতি দেখিয়ে এ ব্যবস্থা করেছে। যে কোন মূল্যে এটা বন্ধ করতে হবে।

ইন্দুরকানী থানার ওসি নাসির উদ্দিন জানান, ওই দিঘিতে মানুষ কি পেয়েছে জানিনা। পুলিশ পিটিয়েও মানুষ ফিরাতে পারছে না। এ বিষয়ে শনিবার বিকালে এলাকাবাসীকে নিয়ে বৈঠক করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ জানান, দিঘির পাড়ে লোকজন জড়ো হবার কথা শুনেছি। বিষয়টি নিরসনের জন্য এলাকাবাসীকে নিয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

 

আরো পড়ুন: সন্ত ঘোষিত হলেন মাদার তেরেসা

নয়া দিগন্ত অনলাইন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, রোববার

শান্তিতে নোবেল জয়ী ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী মাদার তেরেসাকে সন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ইতালির ভ্যাটিকান সিটির সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় এক লাখ পুণার্থীর উপস্থিতিতে পোপ ফ্রান্সিস তাকে সন্ত ঘোষণা করেন।

মাদার তেরেসার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীর এক দিন আগে তাকে সন্ত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭।

আলবেনিয়ায় ১৯১০ সালের ২৫ আগস্ট জন্ম নেয়া আনিয়েজ গঞ্জে বয়াজিও ‘নান’ হন ১৯২৮ সালে। তখন তার নাম হয় সিস্টার তেরেসা। ১৯৩৭ সালের ২৪ মে তেরেসা ‘মাদার’ হন। আজ রোববার সন্ত ঘোষণার পর থেকে তিনি হবেন ‘সন্ত’ (সেইন্ট) তেরেসা। এর পর তার নামে ‘হোলি মাস’ হতে পারবে। চার্চ নামাঙ্কিত হতে পারবে তেরেসার নামে এবং ছবিতে তার মাথার পিছনে ‘হেলো’ বা জ্যোতির্বলয় থাকতে পারবে।

মাদার তেরেসা ১৯৫০ সালে কলকাতায় মিশনারিজ অফ চ্যারিটি নামে সেবা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি গরীব, অসুস্থ, অনাথ, অসহায় ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবা করেছেন। সেই সঙ্গে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির বিকাশ ও উন্নয়নেও নিবিড় পরিশ্রম করেছেন।

প্রথমে ভারত ও পরে পুরো বিশ্বে তিনি তার এই মিশনারি কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন।
১৯৭০-এর দশকের মধ্যেই সমাজসেবী এবং অনাথ ও আতুরজনের বন্ধু হিসেবে তার খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ম্যালকম মাগারিজের বই ও প্রামাণ্য তথ্যচিত্র সামথিং বিউটিফুল ফর গড তার সেবাকাজের প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭৯ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি তার

সেবাকাজের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার ও ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাদার তেরেসার মৃত্যুকালে বিশ্বের ১২৩টি রাষ্ট্রে এইচআইভি/এইডস, কুষ্ঠ ও যক্ষার চিকিৎসাকেন্দ্র, ভোজনশালা, শিশু ও পরিবার পরামর্শ কেন্দ্র, অনাথ আশ্রম ও বিদ্যালয়সহ মিশনারিজ অফ চ্যারিটির ৬১০টি কেন্দ্র বিদ্যমান ছিল।

সন্তু ঘোষণা করার আগে কয়েকটি ধাপে কিছু প্রক্রিয়া থাকে। মাদার তেরেসার ক্ষেত্রে ১৯৯৯ সালে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। সন্ত হওয়ার যোগ্য কোনও ব্যক্তির সন্তায়নের প্রক্রিয়াটি সাধারণত শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর অন্তত পাঁচ বছর পরে। কিন্তু মাদার তেরেসার ক্ষেত্রে পোপ দ্বিতীয় জন পল এই নিয়ম শিথিল করেন। মাদার তেরেসা মারা যান ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। জন পোপ ১৯৯৯ সালে তার সন্তায়নের পদ্ধতি শুরু করার অনুমতি দেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপে এগুতে হয়।

প্রথমে ভক্তরা একটি ডায়োসেস-এর (ক্যাথলিক চার্চের স্থানীয় প্রশাসন) বিশপের কাছে আবেদন জানান যে, ওই ব্যক্তি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাকে সন্ত করার কথা বিবেচনা করা হোক। বিশপ অনুমতি দিলে সেই ব্যক্তির লেখাপত্র, বক্তৃতা, উপদেশ ইত্যাদি সন্ধান করে একটি বিশদ জীবনী লেখা হয় এবং তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার সাক্ষীদের বয়ান সংগ্রহ করা হয়। এই পর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে বলা হয় ‘সারভেন্ট অব গড’ বা ঈশ্বরের সেবক।

এরপর সমস্ত তথ্যপ্রমাণ দাখিল করা হয় এক জন ‘পস্ট্যুলেটর’-এর কাছে। তিনি সংশ্লিষ্ট ‘ঈশ্বরের সেবক’ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করে সব কিছু বিবেচনা করে সন্তুষ্ট হলে সন্তায়ন প্রক্রিয়ার একটা ‘পস্ট্যুলেট’ বা প্রাথমিক ভিত তৈরি করেন।

পস্ট্যুলেট-এর ভিত্তিতে পোপের কাছে সুপারিশ করা হয় তিনি যেন ঈশ্বরের সেবক-এর মহিমার কথা ঘোষণা করেন। পোপ সেই ঘোষণা করলে ঈশ্বরের সেবক ‘ভেনারেবল’ বা মহিমময় আখ্যায় পরিচিত হন।

একটি বৈজ্ঞানিক কমিশন এবং একটি থিয়োলজিকাল কমিশন ‘ভেনারেবল’ মানুষটির সম্পাদিত অন্তত একটি ‘মিরাক্ল’ বা অলৌকিক কীর্তির সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে সেটিকে অলৌকিক বলে স্বীকার করলে পোপের কাছে সেই সিদ্ধান্ত পাঠানো হয়। পোপ যদি মনে করেন, এ সবই সত্যি, তা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ‘বিয়েটিফিকেশন’ ঘোষণা করেন। এর অর্থ: চার্চ এটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করে ওই ব্যক্তির পাপমুক্তি হয়েছে। তিনি আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়ে স্বর্গে প্রবেশ করেছেন।

এই পদ্ধতিতে সন্তায়নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য দ্বিতীয় অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং এক্ষেত্রে পোপের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।

বলা হয়ে থাকে, মাদার তেরেসাকে সন্ত ঘোষণার জন্য যে দুটি অলৌকিক ঘটনা পোপ অনুমোদন করেন তার একটি ঘটেছে ভারতে। ১৯৯৮ সালে দেশটির দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুরের নাকোড় গ্রামের মনিকা বেসরার ওভারির ক্যান্সার মাদার তেরেসার আশীর্বাদে সেরে যায়। ভ্যাটিকান ২০০২ সালে এটি অনুমোদন করে।

অপর ঘটনাটি ব্রাজিলের এক ব্যক্তির। তার মাথায় একাধিক টিউমার হয়েছিল, তিনি আশ্চর্যজনকভাবে সেরে উঠেছেন। আর তার এই সেরে ওঠাকে মাদার তেরেসার আশীর্বাদ বলেই নিশ্চিত হয়েছে ভ্যাটিকান।