রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার মানুষের মধ্যে এখন চরম ভয়াবহ আতঙ্ক গলাকাটা গ্রুপ বিরাজ করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে এ আতংক অনেক বেশী । মাঝে মাঝে বিভিন্ন এলাকায় মসজিদের মাইকে ঘোষনা দেয়া হচ্ছে গলাকাটা ঢুকেছে, সাবধান হোন। মাইকে প্রচারিত এ গুজবে এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জানাগেছে, পাশ্ববর্তী রাজবাড়ী সদর উপজেলায় গত আগস্ট মাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই কায়দায় তিন নারী ও এক শিশুকে গলাকেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ সকল ঘটনায় সারা জেলার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
কিছু কিছু স্থানে হত্যা আতঙ্কে এলাকাবাসী রাতে পাহারার ব্যবস্থা করেছে। এ পরিস্থিতিতে একটি কুচক্রী মহল গুজব ছাড়াচ্ছে পদ্মা সেতুর জন্য রক্ত লাগবে বলে হত্যাকান্ড গুলো ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে গুজবের দ্রুত ডাল-পালা গজিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের খালিয়া গ্রামের মানিক মল্লিকের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪০) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে গেলে এমন সময় চিৎকার শুনতে পায়। এরপরই শোরচিৎকার শুরু হয়। মসজিদের মাইকে ঘোষনা করা হয় স্বশন্ত্র গলাকাটা গ্রুপ ঢুকেছে। এই ঘোষনার পর আতঙ্কিত এলাকাবাসী বাইরে বেরিয়ে আসে।
গৃহবধু জাহানা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে গেলে বসার পর পিছন থেকে কেউ মাথায় হাত দেওয়াসহ গলায় ছুরি ধরার পর সে পড়ে যায়। এরপর কি হয়েছে সে কিছু বলতে পারে না। তার চিৎকারে বাড়ীর লোকজন তাকে উদ্ধার করে।
মানিক মল্লিক জানান, আমার সাথে কারো শত্রুতা নেই। বাজার থেকে বাড়ীর কাজে আসার পরই চিৎকার শুনে বাড়ীতে প্রবেশ করে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন আসে। পরে মমজিদের মাইকে প্রচার করায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এসময় স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল হোসেন জানান, চিৎকার চেচামেচি করার পর মসজিদের মাইকে এ গুজব প্রচার করা হয়। তবে সবাইকে গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সচেতন করা হচ্ছে। এ গুজব শুনে শিশু ও মহিলারা আতঙ্কিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নারুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সালাম জানান, রাতে এলাকার মসজিদে ঘোষনা করা হয় গলাকাটা ঢুকেছে। খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে ঘটনাস্থলে যাওয়া হয়। তবে এলাকার মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ইউপি সদস্যদের ডেকে দ্রুত গুজব সম্পর্কে প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষকে সচেতন করা হবে।
এ বিষয়ে বালিয়াকান্দি থানার এস,আই হাবিবুর রহমান জানান,গৃহবধু আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করেছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ‘এ সব গুজবে কান না দিতে ইতিমধ্যে জনগণকে সচেতন করতে কাজ করা হচ্ছে। কোন স্বার্থান্বেষী মহল এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্টের অপচেষ্টা করে থাকতে পাড়ে।’ এসব গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি জনসাধারনের প্রতি গুজব রটনাকারীদের চিহ্নিত করে পুলিশে সোপর্দ করার আহবান জানান।
আরো পড়ুন :
পদ্মার ভাঙনে নড়িয়ায় হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন
৫ দিনে শতাধিক বাড়িঘর বিলীন
বোরহান উদ্দিন রব্বানী শরীয়তপুর
কিছুতেই থামছে না পদ্মার ভাঙন। প্রতিদিনই বাড়িঘরসহ নতুন নতুন স্থাপনা বিলীন হয়ে যাওয়ায় পদ্মার পাড়ে চলছে কান্না আর আহাজারি। পদ্মার ভাঙনে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাজার হাজার পরিবারের ঘরসংসার। সব কিছু হারিয়ে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে দিশেহারা হয়ে ছুটছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। পদ্মার তীরবর্তী লোকজনের চোখে ঘুম নেই। তারা দিন-রাত তাদের সর্বশেষ সম্বল বাড়িঘর, দোকানপাট সরিয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও চোখের সামনেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাপ-দাদার কবর, বাড়িঘর ও বহুতল ভবনসহ অনেক স্থাপনা। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রাস্তার পাশে বা অন্যের জমিতে খুপড়ি ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাবন করছে। আবার কোনো কোনো পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছে।
এ বছর বর্ষা মওসুমে ভাঙন শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় কোনো কাজেই আসেনি সরকারে এ অতিরিক্ত বরাদ্দ। গত পাঁচ দিনে নড়িয়ার চর জুজিরা, সাধুর বাজার, মুলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। বাসতলা থেকে মুলফৎগঞ্জ পর্যন্ত তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনটি মসজিদ নদীতে চলে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে সুরেশ^র-নড়িয়া সড়ক যোগাযোগ। মারাত্মক ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে মুলফৎগঞ্জ বাজার, নড়িয়া বাজার, পূর্ব নড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় হারিয়ে যাবে আশপাশের আরো অনেক স্থাপনা।
কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রফিক কাজী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছরও বর্ষা মওসুমের শুরু থেকে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা নদীতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গত পাঁচ দিনে নড়িয়া উপজেলার চর জুজিরা, সাধুর বাজার, পৌর এলাকার শুভগ্রাম, পাঁচগাও মুলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকার শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। বাসতলা থেকে মুলফৎগঞ্জ পর্যন্ত তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়াও বাইতুল করিম জামে মসজিদ,পাঁচগাঁও জামে মসজিদ, ছয়টি সেতু নদীতে চলে গেছে।
নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়কের বাঁশতলা আবুল কালাম আজাদের বাড়ি থেকে মুলফৎগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়কটিও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আবার পূর্ব নড়িয়া স্কুলের কাছে কিছু কিছু জাগায় ফাটল দেখা দিয়েছে। এর আগে গত ১৮ আগস্ট রাতে একই সাথে পদ্মায় বিলীন হয়ে যায় নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়কের মুলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন খান বাড়ি জামে মসজিদ ও হজরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতীর অনুসারী গাজী কালুর মেহমান খানা নামের চারতলা ভবন, দিলু খানের দোতলা ভবন, একটি জামে মসজদি ও খান বাড়ি। এ ছাড়াও এ বছর বর্ষা মওসুম শুরু হওয়ার পর থেকে তিন হাজারেরও বেশি পরিবার সব কিছু হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। এ দিকে পদ্মা নদী নড়িয়া বাজার ও মুলফৎগঞ্জ বাজারের কাছে চলে আসায় ব্যবসায়ী ও আশপাশের লোকজন ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সরিয়ে নেয়া হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মালামাল। পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর দাবিÑ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হলে এখনো নড়িয়া বাজার রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
এলাকাবাসী আরো জানায়, এ বছর বর্ষা মওসুমের আগে পদ্মা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে ভাঙনকবলিত এলাকার লোকজন মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও তা বর্ষার আগে বাস্তবায়ন হয়নি। ভয়াবহ ভাঙন রোধে সরকার পদ্মা নদীর দক্ষিণ (ডান) তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প হাতে নেয়। এরপর গত ২ জানুয়ারি তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য এক হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করা হয়। এ বছর বর্ষা মওসুমে ভাঙন শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় তা কোনো কাজেই আসেনি।
কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, গত দুই মাসে পদ্মার ভাঙনে প্রায় তিন হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কোনো জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা কোনো সাহায্য সহযোগিতা করেননি। এলাকায় মহাদুর্যোগ চলছে। সরকারের কাছে দাবি এ এলাকাকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পদ্মা নদী নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খুব কাছে চলে আসায় হাসপাতালের মালামাল জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের নির্দেশে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ইতঃপূর্বে প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্তের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে ৩৫০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে দুই বান্ডেল করে টিন বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান।



