আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ও চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। এ আসনে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির জহুরুল ইসলাম টুলু ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা নেছার উদ্দিনকে দলীয় চূড়ান্ত মনোনিত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে দেশের বৃহত্তম দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে শেষ মুহুর্তের হিসেব-নিকেশ চলছে দলীয় হাইকমান্ডে। মনোনয়নের নিশ্চিত করতে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দ্বারস্থ হয়ে যে যার মত তদবির চালাচ্ছেন।
এ আসনের উজিরপুর ও বানারীপাড়া উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নে মোট ২ লাখ ৯২ হাজার ভোটার। তবে এ আসনে একক কোনো দলের আধিপত্য নেই বলে নব্বইয়ের পর ৬টি নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি ও জেপির (মঞ্জু) প্রার্থীরাও বিজয়ী হয়েছেন।
এ আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন মহাজোট শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, ১৯৯৬ সালে বিএনপির মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে হারিয়ে এমপি হন এক সময়ের তুখর ছাত্রনেতা জেপির (মঞ্জু) গোলাম ফারুক অভি। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বিজয়ী হলেও ২০০৮ সালে বিএনপির এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টুকে ১২ হাজার ভোটে হারিয়ে এমপি হন আওয়ামী লীগের মনিরুল ইসলাম মনি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ভোটে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস।
উজিরপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিবাসী বেশি হওয়ায় যেমন আওয়ামী লীগের সমর্থন বেশি তেমনি পৌর এলাকাসহ বাকি ৫টি ইউনিয়নেও শক্ত অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির অবস্থান সমানে সমান।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ২১জন মনোনয়ন প্রত্যাশির নাম উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্লাটফর্মে। ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে অনেকেই দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন দলয়ি মনোনয়ন নিশ্চিতে। পাশাপাশি সংসদীয় এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে প্রায়ই মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের অহরহ দেখা মিলছে।
তাদের অনেকেই নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে গণসংযোগও করেছিলেন। কিন্তু সরকার দলীয়দের হামলা-মামলায় বিএনপির প্রার্থীদের কোনো খোঁজ মিলছে না। তাঁদের পক্ষে কোনো প্রচারও নেই। বরিশাল-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মো: ইউনুস।
এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি বরিশাল-১ (গৌরনদী আগৈলঝাড়া) আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছিলেন। তিনি জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্বচ্ছ মানুষিকতার রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় এবারো মনোনয়ন প্রশ্নে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
তবে এ আসনে আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে যাদের মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা, ফেস্টুন-ব্যানার ও নৌকার পক্ষে গণসংযোগ এলাকায় চোখে পড়ার মতো ছিলো তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি মনিরুল ইসলাম মনি, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহে আলম তালুকদার, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের দৌহিত্র ফাইয়াজুল হক রাজু, কেন্দ্রীয় আ’লীগের প্রবীণ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান খান, ক্যাপ্টেন এম মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক ছাত্রনেত্রী সৈয়দা রুবিনা আক্তার (মিরা)। বর্তমানে নিজেদের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক হাইকমান্ডে এদের বেশ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
উজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল মজিদ সিকদার বাচ্চু জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আসনে যাকে নৌকার চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবেন আমরা সকল নেতাকর্মীরা তার জন্য কাজ করে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করবো।
অপরদিকে একই আসনে নির্বাচনী কার্যক্রমে পুরোপুরি পিছিয়ে রয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের নির্বাচনী মাঠে দেখাই মিলছে না। তবে এ সকল বিষয়ে বিএনপির স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এরপরও দলটির বিভিন্ন সূত্রের দেয়া তথ্যানুযায়ী জানা গেছে, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল জেলা শাখার সহ-সভাপতি এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু সরদার। তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন।
মনোনয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সান্টু বলেন, আগামী নির্বাচন যেহেতু আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই ভোটের সময় সবাই ধানের শীষের দিকেই তাকাবে।
তিনি ছাড়াও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় আরও রয়েছেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি দুলাল হোসেন এবং কর্নেল (অব:) সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তারা সকলেই বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও এ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন বরিশাল পশ্চিম জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাস্টার আবদুল মান্নান, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা।
তবে সংসদীয় এ আসনের উজিরপুরে বিএনপির প্রার্থী অপেক্ষা স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের তেমন শক্তিশালী কোন প্রার্থী না থাকায় উজিরপুরের সন্তান জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভিকে নিয়ে সকলেরই যেন একটা ভিন্ন চিন্তাধারা লক্ষ করা যায়। কারও কারও অভিমত গোলাম ফারুক অভিকে দেশে ফেরার সুযোগ করে দেয়ার শর্তে আওয়ামী লীগেও দেখা যেতে পারে। সম্প্রতি উজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশালকায় অভির ছবি সম্মিলিত বিলবোর্ড-ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় পার্টির স্থানীয় এক শীর্ষ নেতা জানান, অভির এখনো জেপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় সঙ্গত কারনে দলীয় নেতাকর্মীরা তার অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।



