বিয়ের পর তিনি কোনো দিন রাজবাড়ী শহরে যাননি। জানতেন না কিভাবে পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এমনকি কোনো দিন ভাবেনওনি বাইসাইকেল কিভাবে চালাতে হয়। স্বামী মারা যাওয়ার পর জীবিকার তাগিদে আর একমাত্র সন্তানকে মানুষ করতে বাইসাইকেল ও পত্রিকা নিয়ে ছুটে চলছেন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রির পাশাপাশি করছেন সংসারের কাজ। বলছি রাজবাড়ী শহরের এক সময়ের নামকরা পত্রিকা বিক্রেতা জীবন দাসের স্ত্রী ঝুমু রানী দাসের কথা।
জানা গেছে, ২০০২ সালের ৫ জুন রাজবাড়ী শহরের নিউ কলোনি এলাকার বাসিন্দা পত্রিকা বিক্রেতা জীবন দাসের সাথে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর শ্বশুর শাশুড়ি আর স্বামীকে নিয়ে সুখেই ছিলেন তিনি। বিয়ের দুই বছর পর ফুটফুটে একটি সন্তান আসে তাদের ঘরে। তার নাম রাখা হয় অরণ্য দাস। ছেলেটি এখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে।
২০১৭ সালে হঠাৎই জীবনের কিডনির অসুখ ধরা পড়ে। স্বামীর কিডনির চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চিত সব টাকা ব্যয় হয়ে যায়। চলতি বছর জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য জীবনকে ঢাকায় নেয়া হয়। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। জীবন অসুস্থ হওয়ার পর ছেলে অরণ্য কিছু দিন পত্রিকা সরবরাহ করত। কিন্তু এতে তার পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটত প্রচণ্ডভাবে। ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকতে জীবনই তাকে এ পেশা ধরে রাখতে বলেছিল। এরপর চলতি বছরের ২৫ জুন মারা যান জীবন দাস। তারপর থেকেই জীবিকার সন্ধানে এই ছুটে চলা।
ঝুমু রানী দাস জানান, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলের জন্য নাশতা তৈরি করে ছেলেকে প্রাইভেট পড়তে পাঠিয়ে ভোর সাড়ে ৫টার সময় পত্রিকা বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রি শেষে বাজার সদাই করে বাড়ি ফেরেন। দুপুরের খাবার তৈরি করার পর বিকেলে কালেকশনের জন্য বের হন।
তিনি বলেন, স্বামী বেঁচে থাকতে কখনো বুঝতে পারিনি জীবন সংগ্রাম কি? স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর ছেলেটা ব্যবসার হাল ধরে এতে তার স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বামী বলেন, আমি হাসপাতালে থাকি তুমি বাড়ি গিয়ে ব্যবসাটা ধরো। আর ছেলেটাকে পড়াশোনা করাও। এরপরই আমি ব্যবসার হাল ধরি। প্রথম প্রথম অনেকে কটু কথা বলত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।
রাজবাড়ীর পত্রিকা এজেন্ট মোহাম্মদ কুদ্দুস জানান, ভোর বেলা যখন শহরের বড়পুল এলাকায় পত্রিকার গাড়ি আসে তখন পত্রিকা গোছানোসহ সব কাজে আমরা তাকে সহযোগিতা করি। রাজবাড়ীতে অনেক পত্রিকা বিক্রেতা রয়েছে। নারী পত্রিকা বিক্রেতা হিসেবে তার ব্যবহার ও চলাফেরা খুবই ভালো। তিনি এভাবে ব্যবসাটি চালিয়ে গেলে এক সময় ভালো কিছু করতে পারবেন।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকির আবদুল জব্বার বলেন, জেলা পরিষদ থেকে সব পত্রিকা বিক্রেতাকে এক হাজার টাকা করে সহযোগিতা করা হয়েছে। ঝুমু রানী দাসের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে জেলা পরিষদ থেকে এর আগে সহযোগিতা করা হয়েছে। পত্রিকা বিক্রিটা শুধু ব্যবসা না। এটি একটি সেবামূলক কাজ। এ ধরনের কর্মঠ নারীদের পাশে সমাজের বিত্তবানদের দাঁড়ানো উচিত।