যশোরের চৌগাছায় হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাণ রক্ষাকারী তালগাছ। তালগাছ এক পায় দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে...রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিখ্যাত ‘তালগাছ’ কবিতার তালগাছের দৃশ্য এখন আর গ্রামবাংলার মাঠে কিংবা রাস্তার ধারে তেমন চোখে পড়ে না। আগের দিনে সারি সারি তালগাছের দৃশ্য দেখতে বেশ চমৎকার লাগত। তালগাছ এশিয়া ও আফ্রিকার বৃক্ষগুলোর মধ্যে অন্যতম। এরা এরিকাসিস পরিবারের বরাসুসগণের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। অযতেœ আর আবহেলায় বেড়ে ওঠা এ তালগাছ রোপণে লোকজন এখন আগ্রহ হারিয়েছে।
জানা যায়, তালগাছের পরিবর্তে লোকজন এখন মেহগনি, শিশু, কড়ই, রেন্ট্রিসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি লাভজন গাছ রোপণ করতে বেশি আগ্রহী। আথচ তালগাছ আমাদের দেশে যেকোনো এলাকায় যেকোনো পরিবেশে অতি সহজে বেড়ে উঠতে পারে। পানি ও খরা সহনীয় বলে বিল এলাকায় নিচু-উঁচু উভয় জায়গাতে তালগাছ হয়। তালের রস, তালের গুড়, তালের কচি শাঁস, পাকা তালের পিঠা, বড়া, পাকা তালের আঁটির ফোবল (ফোঁপড়া), খুবই সুস্বাধু খাদ্য। চৈত্র-বৈশাখ মাসে রৌদ্রের দুপুরে প্রচণ্ড গরমে গাছের ছায়ায় বসে তালের রস পানের স্বাদ ও শ্রান্তির ক্লান্তি দূর করার যেমন কোনো বিকল্প নেই তাল পাখার ঠাণ্ডা বাতাসেরও জুড়ি মেলা-ভার। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান সে জায়গাটা এখন দখল করে নিয়েছে।
তালগাছের কাঠ অত্যন্ত মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী টেকসই। তুলানামূলক স্বল্পমূল্যের কারেণ নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবার যথাসম্ভব পরিপক্ব হওয়ার আগেই কেটে ঘর নির্মাণে খুঁটি ও আড়াসহ বিভিন্ন কাজের ব্যবহার করে থাকে। তাল পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়া, হাতপাখা, তালপাতার চাটায়, কুঠলী, পুতুল ইত্যাদি বহুবিধ সামগ্রী তৈরি হয়। তা ছাড়া তালের কাঠ দিয়ে বাড়ি, নৌকা ও হাউজ বোট তৈরি হয়।
উপজেলার মালিগাতি গ্রামের তালগাছি বিনয় পরামাণিক বলেন, বছরে একটি তালগাছ থেকে ৭০০ থেকে এক হাজার হাজার লিটার রস সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে এক শ্রেণীর কাঠ ব্যবসায়ী দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে অর্থের লোভ দেখিয়ে অত্যন্ত উপকারী এবং অর্থকারী ও প্রাণরক্ষাকারী গাছটি অবাধে নিধন করায় তা উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে চৌগাছা সরকারি কলেজের জীব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক (অব:) আবুল কাশেম বলেন, খাদ্যগুনের মধ্যে তালের শাস ও বিচির ফোবল দু’টাই মাবনদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তালের ঘন নির্যাষ থেকে তাল ফুলরি, তাল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তা থেকে গুড় পাটালি, মিছরির মতো সুস্বাদু খাদ্য তৈরি হয়।
চৌগাছা মডেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: আরোঙ্গজেব বলেন, তালে ভিটামিন এবি ও সি জিংক, পটাসিয়াম আয়রন ও ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালরিসহ আরো অনেক খনিজ উপাদান রযেছে। এ ছাড়াও রয়েছে অ্যান্টি অক্সিজেন ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দীন বলেন, দেশে তালগাছ কমে যাওয়ায় বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, তালগাছ উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত নিজে গ্রহণ করে মানুষসহ প্রাণীকূলকে রক্ষা করে থাকে। বর্তমান তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দেশে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ জন্য বেশি বেশি তালগাছ লাগানোর জন্য নানা কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বেসরকারিভাবে পতিত জমি ও পুকুরপাড়, রাস্তার দু’ধারে তালগাছ লাগাতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে কৃষি বিভিাগ।