রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে চত্রা নদী পুনঃখনন কাজ শেষ না হতেই নদীর পাশের পাকা সড়ক ধসে গেছে। পাউবোর এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা এবং বিক্রির ফলে সড়কটি নদীতে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। মাটি বিক্রির জন্য সড়কের উপর মাটি জমিয়ে রাখায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে যানবাহন ও সাধারণ লোকজন। এলাকার লোকজন অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা থামাতে বললেও স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা (এসও) মাহমুদুল হাসান বাধা সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন।
এলাকাবাসী দাবি করেন, চত্রা নদীটি খননের পূর্বেই অনেক গভীর ছিল। নতুন করে খননের কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। সম্প্রতি নদীর তীর দিয়ে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সামান্য কিছু পেটুয়া বাহিনীর পেট ভরতে গিয়ে দুই দফায় সরকারি অর্থ পানিতে চলে যাচ্ছে তৃতীয় দফায় ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আশায়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর আশু সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে গড়াই নদী-সিরাজপুর হাওড়ের উৎপত্তিস্থলের চত্রা নদী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের রাজবাড়ী পওর বিভাগাধীন রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় চত্রা নদীর ১৬০০০ কিলোমিটার ২৩০০০ কিলোমিটার=৭০০০ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজের প্যাকেজ নং-পি-৬/রাজবাড়ী। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১৫৪ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার নূনা ট্রেডার্স ৭.৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২.০০ থেকে ২৩০০০=৭০০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন শুরু করেছে।
বুধবার সকালে সরেজমিন উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের খাটিয়াগাড়া, চরঘিকমলা, বাকসাডাঙ্গী, বিলটাকাপোড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নারুয়া বাজার থেকে লাঙ্গলবাঁধ ঘাট পর্যন্ত সড়কের বাকসাডাঙ্গী এলাকায় সড়ক প্রায় ২ শ’ মিটার জায়গা নিয়ে পাকা সড়ক ধসে নদীতে চলে গেছে। ফলে ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়েছে গেছে। শুধু তাই নয় সামান্য বৃষ্টিতে কাদা পানিতে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা হেঁটে চলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বালিয়াকান্দি-পাংশা সড়কের উপর অবৈধভাবে খননকৃত মাটি বিক্রির জন্য মাটির স্তূপ করে রাখা হয়। সড়কের মাটি পড়ে থাকায় বৃষ্টিতে কাদায় একাকার হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষসহ যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এখনো সড়কের উপর মাটির স্তর পড়ে যাওয়ার কারণে যানবাহন চলাচল করছে চরম ঝুঁকির মধ্যে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ইউনুছ আলী, দুলাল মণ্ডল, আইয়ুব মণ্ডল ও আহেদ আলী জানান, এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে প্রকল্প নেয়ার কথা শিল্প ও বাণিজ্যের। সে প্রকল্প হাতে না নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ প্রকল্প হাতে নিয়ে কামাচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ পেটুয়া বাহিনীরা। চত্রা নদী খনন প্রকল্প নেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা এলাকার মানুষের জন্য কোনো উপকারে আসবে না। কারণ চত্রা নদীটি যে গভীর ছিল নতুন করে খননের প্রয়োজন শুধু হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাটের জন্য। নারুয়া বাজার থেকে লাঙ্গলবাঁধ সড়কটির উপর মাটি ফেলে সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়। সড়কের পাশ কেটে গর্ত করা হয়। এলাকার লোকজন বাধা দিলেও স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও মাহমুদুল হাসান ও মুরাদ হোসেন এলাকার লোকজনের সাথে বাগি¦তণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। জোরপূর্বক রাস্তার সোল্ডার (পাশ) খুঁড়ে খনন করায় এ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
তারা আরো বলেন, সড়কের উপর মাটি ফেলে বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থানীয় লোকজনের কাছে মাটি বিক্রি করায় মাটি স্তূপ করে রাখা হয়। পরে মাটি সরিয়ে ফেললেও সড়কের উপর থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা-পানিতে একাকার হয়ে পড়ে। এতে এক দিকে সরকারি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্য দিকে যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। চত্রা নদীটি যেভাবে গভীর করে খনন করা হয়েছে তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তারপরও তা খনন করেছে। ফলে বর্ষা মওসুম আসার আগেই নদীর দুই পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে কাজ করতে বাধা প্রদান করলেও বালিয়াকান্দি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও মাহমুদুল হাসান এলাকার লোকজনের সাথে দুর্ব্যবহার করে। এ ঘটনার এক সপ্তাহ না যেতেই সড়কের পাশে দেখা দিয়েছে ধস। নদী খনন ও সড়কে ভাঙন এবার ভাঙন প্রতিরোধে নতুন প্রকল্প আসবে।
ঠিকাদারের প্রতিনিধি লুলু বিশ্বাস জানিয়েছেন, যেভাবে মাটি কাটার নিয়ম আছে সে অনুযায়ী কাটা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কয়েকদিন চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সব জায়গায় তো ধস হয়নি। এক জায়গায় হতেই পারে। আমরা তো পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশা অনুযায়ী কাজ করছি। যাতে আর ভাঙনের সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
নারুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: আব্দুস সালাম বলেন, সড়কের পাশ খুঁড়ে খনন করতে আগে থেকেই নিষেধ করেছি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তা না করায় পাকা সড়ক ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে বালিয়াকান্দি উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও মাহমুদুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী যেভাবে কাটছে নিয়ম অনুযায়ী কাটছে। ভাঙনের বিষয়ে বললে এটা সরকার দেখবে, আপনারা অনিয়ম পেলে পত্রিকায় লিখবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাসুম রেজা বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা। একটা ক্ষতি করে আরেকটার উন্নয়ন করা নয়। এ বিষয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আমি জানতে পেরেছি নদী খনন করায় সড়ক ধসে পড়েছে। আগামী জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।



