কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের চৌরাস্তার সংযোগস্থলে বিশ্বরোডের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে পিরিজপুর বাজার। বাজারের পশ্চিমে একটু এগুতেই কটিয়াদী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ। এ নদের চরবেষ্টিত গ্রামীণ আঁকাবাকা সবুজ বন, কখনো ফসলি জমিনের মাঠের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেছে কালো পিচঢালা পথ। সে পথ ধরে দুই কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়ে বাহেরচর গ্রাম। গ্রামটি কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত। রাস্তার পাশেই বাহেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। সে রাস্তা ধরে একটু সামনে যেতেই চোখে পড়বে নিহত নার্স তানিয়ার বাড়ি। বাড়িটিতে রয়েছে টিনের দুচালা দুটি ঘর। টিনের দুচালা ঘরের সামনে উঠোনে পাতানো কয়েকটি চেয়ার। প্রতি বছর এ সময়টাতে হাসি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস লেগে থাকতো যে বাড়িটিতে সে বাড়িতে আজ কেবলই শুধু নিরবতা। এখনো লোকজন আসছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বিমর্ষ অবস্থায় বসে আছেন তানিয়ার বাবা মো: গিয়াস উদ্দিনসহ তানিয়ার চার ভাই।

বড় ভাই আখতারুজ্জামান বাদল বলেন, ‘ঢাকায় আমার একটি জুতার ব্যবসা আছে। আমি যদি জানতাম আমার বোনের এমন হবে তবে আমি সাথেই আসতাম। সে মানুষের সেবা করে কিন্তু তার পরিণতি এমন হবে কখনো আমরা ভাবি নাই- বলে কেঁদে উঠলেন তিনি।

অপর ভাই মনিরুজ্জামান সবুজ বলেন, তানিয়া সবার ছোট হওয়ায় পরিবারের সবার আদরের ছিল। আমি দেশের বাইরে থাকি। তার চেহারা, উচ্চতা প্রায় আমার সমান ছিলো।

একদিন তানিয়া বলে, ‘ভাই, আমি তো বেতন পেয়েছি! তোমার জন্য একটা ব্লেজার কিনতে চাই। তোমার গায়ের মাপটা দাও।’ তারপর আমি বললাম, ‘তোর গাঁয়ে যে ব্লেজারটা লাগবে, সেটা তো আমার গায়েও লাগে। তোর গায়ের মাপেই নিয়ে আয়।’ এরপর সে আমার জন্য গত শীতে একটা ব্লেজার নিয়ে আসে।

মেজো ভাই শফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘আমার মা দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। তানিয়া সেই সময়টা মায়ের কাছাকাছি ছিল সবটুকু সময়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন (৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮) মা মারা যান। কিন্তু মা মারা যাওয়ার চার মাসের মাথায় আমার বোনের মৃত্যুটা মেনে নিতে পারছি না।’

কথা হয় ছোট ভাই ঢাকার বিএসএমএমইউ হাসপাতালের (সাবেক পিজি) সিনিয়র স্টাফ নার্স কফিল উদ্দিন সুমনের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি আর তানিয়া ঢাকার কল্যাণপুরে একটি বাসা নিয়ে থাকতাম। আমি পিজিতে আর সে ইবনে সিনায় সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে চাকরি করতো। যে এলাকাটায় থাকতাম সে এলাকাটার আশেপাশের অনেক মহিলা, লোকজন ওর কাছে আসতো সেবা, পরামর্শ নিতো। আমার ঢাকায় যেতে ইচ্ছে করছে না।

বাবা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘এবারের রমজান মাসটা গেল অনেক কষ্টে। ঈদ, আনন্দ বলতে কিছুই নেই বাড়িতে। ঈদ এলে তানিয়াই বাড়িটাতে আনন্দে উল্লাসে ভরিয়ে রাখতো। সেও নেই ঈদও নেই।’

তবে পরিবারের সকলেই দাবি করেন, ‘অন্য কোনো পরিবারে যেন এমন না ঘটে। কোনো সন্তান যেন এমন পরিস্থিতে না পড়ে। এ রকম নির্মম, পৈশাচিক ঘটনার বিচার যেন দৃষ্টান্তমূলক হয়।’

এ দিকে নিহত নার্স শাহীনূর আক্তার তানিয়ার পরিবারের ঈদ আনন্দে শরীক হতে উপহার সামগ্রী নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা যুবলীগের সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ মনোনীত কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তানিয়া সুলতানা হ্যাপী, কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো: মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএমের পক্ষে বাজিতপুর থানার ওসি মো: খলিলুর রহমান, ওসি (তদন্ত) মো: সারোয়ার জাহানসহ উপজেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

নার্স তানিয়া হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো: সারোয়ার জাহান জানান, কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ তানিয়ার পরিবারের পাশে সুখে-দুঃখে পাশে রয়েছে। মূলত সেজন্যই জেলা পুলিশ সুপার মহোদয় এ পরিবারের জন্য ঈদ উপহার৷ পাঠিয়েছেন। আমরা তানিয়ার পরিবারকে সেই সহমর্মিতা কামনা করছি।

উল্লেখ্য, গত ৬ মে সোমবার রাতে বিমান বন্দর কাউন্টার থেকে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর রুটে চলাচলকারী স্বর্ণলতা পরিবহনে কটিয়াদী হয়ে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত বাসেই বিলপাড় গজারিয়া নামক স্থানে গণধর্ষণের পর ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টাফ নার্স শাহীনূর আক্তার তানিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাসের ড্রাইভার-হেলপারসহ পাঁচজন। এর পর থেকেই এ পরিবারটির হাসি-আনন্দ হারিয়ে গেছে। ঈদ দুয়ারে এলেও আনন্দ বলতে কিছু নেই। কেননা ঈদ এলে একা তানিয়াই বাড়িটাকে আনন্দে উল্লাসে ভরে রাখতো।