রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামের দশম শ্রেণীর ছাত্রী জুথি খাতুনকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রধান আসামি শিল্পী বেগমসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে সদর থানা পুলিশ।

রাজবাড়ী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) স্বপন কুমার মজুমদার জানান, ইতিমধ্যেই ঘটনার সাথে জড়িত ও মামলার প্রধান আসামি শিল্পী বেগম ও তার ভাগ্নে সেতুকে (২৪) আটক করা হয়েছে।

ওসি আরো জানান, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশের অন্য দু’টি দল।

শনিবার দিবাগত গভীর রাতে খানখানাপুর এলাকা থেকে সেতুকে আটক করে পুলিশ। আটককৃত সেতু ওই গ্রামের বাবলুর ছেলে।

পরে তার দেয়া তথ্য মতে তার খালা শিল্পী বেগমকে আজ রোববার সকালে আটক করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে খানখানাপুর তমিজউদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী জুথি খাতুনকে (১৬) বাড়ি থেকে তুলে পার্শ্ববর্তী পাট ক্ষেতে নিয়ে মুখ, হাত-পা বেঁধে গায়ে আগুন দিয়ে ফেনীর নুসরাত স্টাইলে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে বোরকা পরিহিত চার দুর্বৃত্ত। এ সময় ওই ছাত্রীর পরিবারের লোকজন টের পেয়ে চিৎকার করলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শনিবার সকালে ওই ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর মিজির স্ত্রী শিল্পী বেগমের (৪০) নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত চারজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

ওই ছাত্রীর বাবা ফজলুর রহমান বেপারী জানান, ‘গত ১২ এপ্রিল দুপুরে তার মেয়ে সদর উপজেলার খানখানাপুর থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির রিকশায় নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। তার রিকশাটি পার্শ্ববর্তী দেওয়ানপাড়া মোড়ে পৌছলে অজ্ঞাতনামা চার ব্যক্তি তার গতিরোধ করে। সেই সাথে ওই ব্যক্তিরা মেয়েকে টেনে-হেঁচড়ে পাশের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে চাকুর ভয় ও মারপিট করে জোরপূর্বক তার অশ্লীল ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করে এবং ওই ছবি আসামি শিল্পীর কাছে পৌঁছে যায়।

পরবর্তীতে আসামি শিল্পী বেগম ওই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে তার মেয়ের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। গত ৩ জুন দুপুরে শিল্পী বেগম ও তার আরো দুজন সহযোগী বসতবাড়িতে আসে এবং জানালা দিয়ে মেয়েকে ডেকে ঘরের বাইরে আনে। সেই সাথে অশ্লীল ছবি পুনরায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে মেয়েকে তার এক ছেলেবন্ধু রাজুর (২২) বাড়িতে নিয়ে যায় এবং ওই ছেলেবন্ধুর কাছে আসামিরা আড়াই লাখ টাকা দাবি করে মেয়েকে ওই বাড়িতে রেখে চলে যায়।

পরবর্তীতে ওই ছেলেবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা মেয়েকে আসামি শিল্পীর বাড়িতে নিয়ে আসে এবং তাদের (মেয়ের) পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি অবহিত করে। ওই সময়ই তিনি গিয়ে শিল্পীর বাড়ি থেকে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

এ ঘটনার পর দিন গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার মেয়ে নিজবাড়ির বারান্দায় বসে জাম খাচ্ছিল। সে সময় ওই বাড়িতে অজ্ঞাতনামা বোরকা পরিহিত চার ব্যক্তি প্রবেশ করে। তারা মেয়ের মুখ চেপে ধরে বাড়ির পেছনে থাকা একটি পাট ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে যায়। তারা মেয়ের ওড়না দিয়ে তার হাত, পা ও মুখ বেঁধে খুন করার উদ্দেশ্যে শরীরের মাঝামাঝি স্থানে থাকা স্যালোয়ার কামিজে ম্যাচ কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে শরীরের সামনের অংশে সামান্য পোড়া জখম হয়। মেয়ে তখন জীবন রক্ষার্থে মাটিতে গড়াগড়ি করে। মেয়ের গোংড়ানির শব্দে তার মাসহ প্রতিবেশিরা এগিয়ে যায় এবং তার শরীরের আগুন নেভায়। পরে তাকে স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।’

প্রতিবেশীরা জানান, ওই মেয়ে ও তার মায়ের চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে আসেন এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করেন।

সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী আলমগীর জানান, ‘শিল্পী বেগমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভালো নয়। শিল্পী বেগম ভালো মানুষ নন। তাকে এলাকার মানুষ ভয় পায়। দিন-রাত তার কাছে নানা ধরণের মানুষ আসে। যে কারণে তাকে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। তাছাড়া যে ঘটনা ঘটনানো হয়েছে, তা একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। অল্পের জন্য মেয়েটা প্রাণে বেঁচেছে। তাই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে এমন ঘটনা আর না ঘাটে।’

এদিকে, মেয়েটির ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ভাই সোহেল বেপারী তার ফেসবুক পেজে মেয়েটির সালোয়ার কামিজে আগুন দেবার ছবি প্রচার করে। ফলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হয়।

ওই স্কুলছাত্রী জানায়, ‘এক ছেলে আমাকে পছন্দ করতো। এই পছন্দের কথা আসামি শিল্পী বেগম জানতে পেরে তাকে সুকৌশলে বিপদে ফেলে। সেই সাথে আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। আমি বিষয়টি পরিবারকে জানাই। আর এ কারণেই শিল্পী আমার হাত-পা বেঁধে জামায় আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে।’

অপরদিকে, গত শনিবার দুপুরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে থাকা আসামি শিল্পীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ওই বাড়িতে কেউ নেই। বাড়িটি বেশ সুরক্ষিত। বাড়ির চারপাশে টিনের বেড়া। বাড়িতে প্রবেশ করতে হলে কমপক্ষে তিনটি দরজা পার হতে হয়। যে সব দরজাতে তালা লাগানো রয়েছে।