যে বয়সে পরিবার পরিজনকে সাথে নিয়ে আনন্দের সময় কাটানোর কথা, সে সময়ে নিদারুন এক কষ্টের মধ্যে সময় পার করছেন ৮০ বয়সের এক বৃদ্ধ। নাম তার আব্দুল মজিদ। একটি চৌকি, মশারি, ওযুর বদনা, থালা, গ্লাস, জগ আর গায়ের পোশাক হচ্ছে তার সহায় সম্বল।
এই নিয়ে বৃদ্ধের ঠাঁই হয়েছে ঢাকা-দোহার আন্তঃসড়কের লক্ষীপ্রসাদ পোদ্দারবাড়ির একটি পরিত্যক্ত দোকানে। কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে দিন কাটে। পরিবারের সদস্যরা কোন ধরনের খোঁজ খবর না নেওয়ায় জীর্ণশীর্ণ শরীরে গত কয়েক বছর ধরে এভাবেই দিন কাটছে তার।
জানা গেছে, ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার বারুয়াখালী এলাকার মৃত দুখাই মিয়ার ছেলে আব্দুল মজিদ। একসময়ে তাঁতের লুঙ্গি বুনিয়ে বিক্রি করে চলত তার সংসার। খেয়ে পড়ে ভালই ছিলেন। জীবনের একটা সময়ে কলকাতায় চাকরিও করেছেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসের শিকার আব্দুল মজিদ। ছেলে মেয়েদের লালন পালন করতে গিয়ে বিক্রি করেছেন বসতবাড়ি ও ভিটা মাটি। আব্দুল মজিদের স্ত্রী, দুই ছেলে দুই মেয়ে থাকলেও কেউ আজ পাশে নেই। শরীরে নানা অসুখ বিসুখ দানা বাঁধলেও সে কথা জিঞ্জেস করার মতো কেউ আর নেই। শেষ জীবনের শেষ সময়ে দুঃসহ এক জীবনই সাথী হয়েছে এই বৃদ্ধার।
জীবনের একটা সময়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছেলে মেয়েদেরকে বড় করেছেন। রাতদিন লুঙ্গি বুনার কাজ করেছেন যাতে ছেলেরা সন্তানেরা একটু সুখে থাকলে পারেন। উৎপাদিত লুঙ্গি বাজারে বিক্রি করে খাবার জোগাড় করেছেন। নিজের কথা না ভেবে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেছেন।
তাঁতে বুনানো লুঙ্গি বিক্রি করেছেন লুঙ্গির হাট জয়পাড়া, পালামঞ্জ, রুহিতপুর বিক্রি করেছেন। জীবনের একটা সময়ে এসে ধারদেনা হয়ে পড়ায় বিক্রি করেছেন নিজের বসতঘর ও বসতভিটার ৮ শতাংশ জমিও। জমি বিক্রি করার পর ছেলেরা যার যার মতো করে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু সেই ঘরে জায়গা হয়নি সংসারের ঘানিটানা ব্যক্তিটির।
বাড়ি বিক্রির পর দোহারের অরঙ্গবাদ, বাহ্রা এলাকায় অনাহারে অর্ধাহারে কেটেছে অনেকটা দিন। পরিচিত কিংবা অপরিচিত মানুষের কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকতে হয়েছে। সেইদিনের সেই কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দু’চোখ বেড়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কিনা করেছি ছেলে সন্তানের জন্য। আজকে ছেলে মেয়েরা কেউই একটু আশ্রয় দিতে চায় না। স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ নাতি নানতি সবাই আছে। আমার খোঁজ খবর কেউ নেয় না। আমার মেয়ে রোকেয়া বিদেশে গেছে। অন্যের মুখে শুনেছি বিদেশে গিয়ে ভাল আছে। আমি কী খাই, না খাই... কোথায় থাকি সে খবর কেউ রাখে না।
তিনি জানান, কয়েক বছর আগে বড় ছেলে মারা গেলেও ছেলের স্ত্রী নাতি নানতি আছে। কেবল আমার কপালই মন্দ। তাহলে সবাইকে ছাড়া এই কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকব। আমি এখন আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করি, আল্লাহ তুমি আমাকে নিয়ে যাও। এতো কষ্ট নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই না। রাত নামার পর তার শোয়ার কক্ষটিতে বাতি জালানোর ব্যবস্থাও নেই। আশাশের বাড়িঘরের মানুষের কাছে থেকে খাবারের আয়োজন হয়। চলাফেরা করতে কষ্ট হয় বলে অনেক সময় হেটে গিয়ে খাবার না আনতে পারলে না উপোস থাকলে হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত তিন মাস ধরে একটি পরিত্যক্ত দোকানে বসবাস শুরু করেন তিনি। দোকান ভাড়া হয়নি বলে দোকান মালিকও কিছু বলছে না বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয়রা জানান, ভীষণ অসুস্থ নিয়ে এখানে এসেছেন। এইভাবে এক সময় যখন অচল হয়ে যাবে তখন তাকে কে দেখবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজা আক্তার বিরা বলেন, পিতামাতাকে ভরণ পোষণের জন্য এখন সরকার একটি আইন করেছে। যদি ওই ব্যক্তির ছেলে মেয়ে থাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বৃদ্ধের ঘরে ফেরার আকুতি থাকলেও স্বজনদের দুর্ব্যবহারের কারণে ফিরে যেতে চান না নিজ ঘরে।



