সুনসান পরিবেশ। চিন্তার জগতে প্রবেশের আবহ। এ জগতে ঢুকে কেউ ভাবেন তার ব্যক্তিগত সংকট-সমস্যা নিয়ে। কেউবা জীবনের রঙিন স্বপ্ন বোনেন। আবার কেউ ইহকাল পরকাল নিয়ে চিন্তার জগতে থাকেন ডুবে । যদি কেউ এমনই কোনো চিন্তায় মগ্ন থাকেন তার চিন্তায় ছেদ পড়বেই লুতো পাগলার দরাজ গলার সঙ্গীতে। হ্যাঁ, দরাজ গলাই বলতে হবে। বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই তিনি যে গান গেয়ে থাকেন তাতে মোহিত হন সবাই।
লুতো পাগলার বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানীতে। তার আসল নামটিতে কেউ চেনে না। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মেম্বর প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই সময় দেখা গেল তার নাম লুৎফর রহমান। তিনি তার প্রচারপত্রে কবিতা আকারে লিখেছিলেন;
‘কথা কাজে এক আমি লুৎফর,
এলাকার ভাই, সকলের দোয়া চাই’।
এই লুৎফর ওরফে লুতো ভোট পুলুকে। ইউপি নির্বাচন আসলে তার আর কোনো কিছু খেয়াল থাকে না। মেম্বর পদে দাঁড়িয়ে যান। এক ডজন বার প্রার্থী হয়েছেন কিন্তু পাস করতে পারেন না। তাতে ওর কোনো দুঃখ নেই। তবে ওর একটা বড় সান্তনা এলাকার প্রায় সবাই ওকে মেম্বর বলে ডাকে। ওতেই তিনি সন্তুষ্ট।
লুতো পাগলা বলে ওকে পাগল ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বৃক্ষ রোপণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যশোর- বেনাপোল সড়কের লাউজানী থেকে তার বাড়ির পাশ দিয়ে যশোর সদর উপজেলার নারাঙ্গালীর দিকে যে রাস্তাটি গেছে সেই রাস্তার নওয়াপাড়া পর্যন্ত দু’কিলোমিটার এলাকায় এই গাছ লাগিয়েছেন। শিশু, মেহগিনি ও লম্বুসহ বিভিন্ন জাতের এই গাছের সংখ্যা ৬৪৭।
ঘরে চাল নেই । কিন্তু হলে কি হবে, গাছ লাগানো তার নেশায় ধরেছে। আর তাই এনজিও অথবা বিভিন্ন সমিতি থেকে লোন নিয়ে চারা কিনে এ গাছ লাগিয়েছেন। এভাবে ২০০৩ সালে এই গাছ রোপণ করেই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেননি। সন্তান স্নেহে তত্ত্বাবধান করে বড় করেছেন। নিঃসন্তান লুতোর গাছগুরোই যেন সন্তান।
লুতো কিন্তু শুধু সন্তানহীন নন। তার কোনো জায়গা-জমি নেই। রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে ঘর তুলে সেখানে বসবাস করেন।
লুৎফর রহমান জানান, গাছ লাগিয়ে ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি সম্পাদন করেন ঝিকরগাছা ইউনিয়ন পরিষদের সাথে। নিবিড় বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষনের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ শেষে তিনি গাছের বিক্রিত মূল্যের ৬০ শতাংশ ও ইউনিয়ন পরিষদ ৪০ শতাংশ পাবে। ইতোমধ্যে তার চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হয়ে প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেছে।
তিনি জানান, চুক্তি অনুযায়ী দু’পক্ষের উপস্থিতিতে গাছ বিক্রি করা হবে। তিন বছর আগে এই গাছের দাম ওঠে ২৮ লাখ টাকা। বর্তমানে ৩০ লাখ টাকা হবে বলে তার ধারণা। এ থেকে তিনি পাবেন ১৮ লাখ টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদ পাবে ১২ লাখ টাকা। আর গাছ বেচা ওই টাকা হাতে আসলেই লুৎফর রহমান লাখোপতি। কথা প্রসঙ্গে এমন একটা কথা উঠলে স্মিত হেসে তিনি বলেন, কিন্তু এখন তো আমি সর্বহারা।



