স্বামী-সন্তান ভিটেমাটি সব হারিয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জমি আছে ঘর নাই, নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ, আশ্রয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় ঘর পেলেন সত্তুরোর্ধ্ব ফজিলা খাতুন। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে আনন্দে আত্মহারা ওই বৃদ্ধা। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দু’হাত তুলে প্রধানমন্ত্রী ও সহযোগী সবার জন্য দোয়া করছেন সর্বক্ষণই।
১৯৯৮ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাগামারা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ফজিলার চার সন্তান ও স্বামী আবদুল বারেক। ওই দুর্ঘটনায় নিজেও আহত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ফজিলা। পাগলপ্রায় ওই নারী ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফেরার পর স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রায় দুই বছর। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে স্বামীর বাড়ি উপজেলার গোলাভিটা গ্রামে ফিরে দেখেন ডায়রিয়াজনিত কারণে তার বাকি দুই সন্তানও মারা গেছে। স্বামী-সন্তানহারা ফজিলার স্বামীর বাড়িতে ঠাঁই না হওয়ায় ফিরে যান ত্রিশাল উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছলিমপুর গ্রামে বাপের ভিটায়। নি¤œবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়ায় সেখানে অবস্থান করাতেও বাধা আসে। অনেক আগে স্বামীর টাকায় বাপের বসতবাড়ির পাশেই কিনেছিলেন দেড় শতক জমি। মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু পুরনো টিনের চাল আর পলিথিন ও প্লাস্টিকের বস্তায় ওখানে একটি ঘর ওঠে। কোনো দিন ভাগ্যে খাবার জুটত আবার কোনো দিন না খেয়ে পড়ে থাকতে হতো ফজিলাকে। একসময় বাধ্য হয়েই বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। ভিক্ষা করতে ভালো না লাগায় বেছে নেন ভিন্ন পথ। প্রতিদিন ত্রিশাল বাজারে গিয়ে মিষ্টির দোকান থেকে খালি দইয়ের পাতিল কুড়িয়ে আনেন। সেগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করতে থাকেন চালের বিনিময়ে। যা পান তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চলে যায় তার। একপর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদ আমিনের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জমি আছে ঘর নাই, নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ, আশ্রয়ন প্রকল্প-২’-এর আওতায় ঘরের জন্য আবেদন করেন। এরপর ওই ইউনিয়নের নায়েব ও উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের সরেজমিন যাচাই-বাছাইয়ের পর ঘর পান ফজিলা।
জানা যায়, ‘জমি আছে ঘর নাই, নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ, আশ্রয়ন প্রকল্প-২’-এর আওতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ৮০টি পরিবার বর্তমানে নতুন ঘরে বসবাস করছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ১৫৭টি অসহায় দিনমজুর ও ভিক্ষুক পরিবারকে ওই সুবিধা দিতে এক কোটি ৫৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি সার্বিক তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাকির। জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তালিকা ও উপকারভোগীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নায়েবদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে যাদের জমি ছাড়া কিছুই নেই, সেসব প্রকৃত অসহায় পরিবারের মধ্যে এক লাখ টাকা খরচ করে টিনশেড ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ঘর তৈরি হচ্ছে দৈর্ঘ্য ১৬ ও প্রস্থ ১৫ ফুট করে।
সরেজমিন উপজেলার সদর ও ধানীখোলা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, চকচক, ঝকঝক করছে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্প-২-এর উদ্যোগে দরিদ্র পরিবারের মধ্যে দেয়া নতুন ঘরগুলো। দূর থেকে চোখে পড়ে নতুন ঘরগুলো। ঘর পেয়ে গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে আনন্দের স্রোত বইছে। স্বপ্নের নতুন ঘর পেয়ে অসহায় পরিবারগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মঙ্গল কামনা করে হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন।
ফজিলা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমের কারণে বাড়ি থেকে বের না হতে পেরে নতুন ঘরের বারান্দায় একা একা বসে আছেন। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত ওই নারী শেষ বয়সে এসে এখন যেন অনেকটা স্বস্তিতে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ প্রকল্পের ঘর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা তিনি। সব সময় আঁচল পেতে দোয়া করেন, প্রধানমন্ত্রীসহ যারা ঘর পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তাদের যেন আল্লাহ ভালো রাখেন।
সদর ইউনিয়নের চকপাঁচপাড়া গ্রামের নাছিমা খাতুন। প্রতিবন্ধী স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালান। পলিথিনে মোড়ানো ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। রোদ-বৃষ্টি, শীতের কষ্ট ছাড়াও ঝড়ের দিনে সন্তানদের নিয়ে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় থাকতেন তিনি।
ধানীখোলা ইউনিয়নের মধ্য ভাটিপাড়া গ্রামের মাহমুদা খাতুনের স্বামী দীর্ঘ দিন অসুস্থ। দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে দিনমজুরের কাজ করে বাবার চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালায়। শ্বশুরের আমলে নির্মিত পরিত্যক্ত একটি মাটির ঘরে থাকতেন তিনি। পাকা তো দূরের কথা টিনশেড ঘরের কথা কল্পনাতেও আসেনি কোনো দিন... এমনটাই জানান মাহমুদা। এখন তারা নতুন টিনশেড ঘরে থাকছেন। তাদের এখন আনন্দের সীমা নেই।
ইউএনও আব্দুল্লাহ আল জাকির বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জমি আছে ঘর নাই, নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ, আশ্রয়ন প্রকল্প-২’-এর কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তালিকা ও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নায়েবদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে যাদের জমি ছাড়া কিছুই নেই, সেসব প্রকৃত অসহায় পরিবারের মধ্যে এক লাখ টাকা খরচ করে টিনশেড ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ রকম ১৫৭টির মধ্যে ৮০টি পরিবার নতুন ঘরে বসবাস করছে।
ত্রিশাল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মতিন সরকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া গৃহহীনদের ঘর নির্মাণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা সরেজমিন গিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর দিয়েছেন। এতে উপজেলার ১৫৭টি অসহায় দরিদ্র পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।