কোরবানির ঈদ এলেই বিশেষ করে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ গনিমিয়ার হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকে মিরকাদিমের ধবল গরুর। অন্যান্য এলাকা থেকেও লোকজন এখান আসে এই গরুর সন্ধানে। অনেক দামে কিনে নেয় পুরান ঢাকার খানদানি লোকেরা। কারণ : ‘ইনজেকশন বা গরু মোটাতাজার কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। সাদা গরু এখন পাওয়া যায় না তাই বিভিন্ন রংয়ের গরু বানানো হয়। খামারের ভেতরের পরিবেশ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। বাইরের কাউকে খামারের ভেতর ঢুকতে পর্যন্ত দেয়া হয় না।’
৮০ হাজার থেকে ৮ লাখ টাকা এ গরুর মূল্য হয়ে থাকে। তবে মিরকাদিমের গরু মুন্সীগঞ্জের কোনো হাটে বিক্রি হয় না।
অবশ্য, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার কুলুপাড়ার ধবল গরু লালন পালন করার যে ঐতিহ্য তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। ২০০ বছরের ঐতিহ্য এই ধবল গরুর ব্যবসা এখন মিরকাদিমে হারিয়ে যেতে বসেছে তার জৌলুস।
তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই রাজসিক একটি ভাব আছে এখানকার মানুষের মধ্যে। তারা এখন কোনো না ঐতিহ্য লালন করে চলেছে ইতিহাসের পরম্পরায়। তেলের মিল, বহু চালের মিল ছাড়াও এখানে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের পুরনো ঐতিহ্যটাকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে মিরকাদিমের বিখ্যাত সাদা ধবল গরুর ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে দিনে দিনে। ভেজালযুক্ত খাবার দিয়ে গুরু মোটাতাজা করে দ্রুত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে কিছু খামারিরা। সেখানে ৮ মাস দীর্ঘ পরিশ্রম করে লাভবান না হওয়ায় এ ব্যবসা থেকে সরে আসছে মিরকাদিমের ধবল গরু ব্যবসায়ীরা। ভেজাল খাদ্যের যোগান দিয়ে গরু বড় করে দ্রুত লাভবান হওয়ার হাতিয়ারকে এখন কাজে লাগাচ্ছে সবাই। ফলে ২০০ জনের বেশি ধবল গরুর খামার মালিক থেকে এখন ১০-১২ জনে নেমে এসেছে। তাও বেশি গরু তৈরী করেন না। ৪-৬টা গরুর বেশি কোনো খামারির কাছে নেই। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই দেশী এ ধরনের মান সম্মত গরু তৈরী হবে মুন্সীগঞ্জে এমনটিই মনে করছেন খামারিরা।
ধবল গরু খামার মালিক নুর মোহাম্মদ মুন্না বলেন, ধান-চাল আর তেলের কারখানা থাকার কারণে মিরকাদিমের ভূষি, কুড়া, খৈলসহ বিভিন্ন উন্নতমানের গরুখাদ্য খুব সহজে পাওয়া যায়। এখানকার ব্যবসায়ীরা মিরকাদিমের গরুকে মিনিকেট চালের খুদ, এক নাম্বার খৈল, ভাতের মার, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভুসি, গমের ভূষি, বুটের ভূষি খাওয়ান। এছাড়া গরু পালনে প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করা হতো মিরকাদিমে।
তবে দিন দিন গরুর এই ব্যবসাটিতে এখানকার ব্যবসায়ীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। ভূষি, কুড়া আর খৈলের দাম বৃদ্ধি আর অপ্রতুল হওয়ার তারা হতাশ। এছাড়া ভেজালযুক্ত মানুষের ক্ষতিকর খাবার মাংস বৃদ্ধির জন্য ইউরিয়া সারসহ মোটাতাজাকরণ ওষুধ বন্ধ করলেই দ্রুত এমন সুস্বাদু গরুর মাংসের খামারি আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তাদের দাবী। সরকারিভাবে জায়গার অভাব ও খামার তৈরী করা এবং এদের পৃষ্ঠপোষকতা করলে পুনরায় এই ব্যবসায় জৌলুস আসতে পারে বলে মনে করছেন খামার ব্যবসায়ীরা।
খামার মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানকার এসব গরুর সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ গনিমিয়ার হাটে। যুগ যুগ ধরে এই হাটে মিরকাদিমের বিখ্যাত সব গরু পাওয়া যায়। যা অনেক দামে কিনে নেয় পুরান ঢাকার খানদানি লোকেরা। এছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে খাওয়ায় সুস্বাদু এই গরু কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে রহমতগঞ্জের গনিমিয়ার হাটে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকে আবার আগেভাগে মিরকাদিমে এসে ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা দিয়ে যায়। পরে ঈদের আগে তাদের গরু বুঝে নেন। কয়েক মাস ধরে লালন পালন করে গরুর মালিককে বুঝিয়ে দেয়ার বিষয়টি বহু আগে থেকেই চালু রয়েছে।
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সবেমাত্র এক সপ্তাহের জন্য ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠে (গনিমিয়ার হাট পুরনো নাম) মীরকাদিমের সাদা গরুর হাট বসে। মীরকাদিমের গরুর কদর ও দাম একটু বেশি।
খামারের শ্রমিকরা জানান, আগের মত ঘরে ঘরে মিরকাদিমে গরু কেউ বানায় না। রহমতগঞ্জের গনিমিয়ার হাট বলতে মিরকাদিমের গরুকে বোঝাত। এখন হাতেগোণা কয়েকজন গরু পালন করে। ‘মিরকাদিমের ধবল গরু বানাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। ভারত ও ভুটানের আবাল-পশ্চিমা সাদা ষাঁড় ও সাদা গাভীর বাচ্চা কিনে আনেন মীরকাদিমের খামারিরা। নিজের বাচ্চার মতো লালন করি। নতুন গামছা দিয়ে গোসল করাই। সব সময় চোখে চোখে রাখি। প্রতিটি গরু বড় করতে ও কোরবানির হাটে বিক্রি করার জন্য উপযোগী করে তুলতে ৪-৬ মাস সময় লাগে।’
তারা জানান, বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে আসা গরু কিনে এনে লালন করে থাকেন। ছোট বুট্টি গরু ১০-২০ হাজার টাকায় কিনে আনি ৪-৫ মাস লালন করে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। এই গরু বেশি বড় হয় না। দেখতে গোল গাল। আর নেপালি ও ভারতের অন্য প্রজাতির বড় গরু কিনি প্রায় লাখ টাকা আর ছয় মাস লালন পালন করে বিক্রয় হয় ২ থেকে ৬ লাখ টাকা। প্রতি গরুর পিছনে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি।






