জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ (সদর) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়তে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বড় ছেলে রাহগীর আল মাহী সাদ।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন তিনি। এ সময় জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি, এস এম ফয়সাল চিশতী, ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম, লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি তার পাশে ছিলেন। এর আগে গত সোমবার রাতে এরশাদের বোন মেরিনা রহমানের মেয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর স্ত্রী মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পা মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। এ ছাড়া জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, দলের যুগ্ম মহাসচিবের পাশাপাশি রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টিরও সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। যদিও এরশাদ-বিদিশার প্রতিবন্ধী সন্তান এরিক এরশাদকে নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে নেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন এস এম ইয়াসির।
এ দিকে এরশাদ বেঁচে থাকতে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফও প্রার্থী হতে চান বলে শোনা যাচ্ছে। এ জন্য আসিফ দলের সদস্যপদ ফিরে পেতে চেষ্টা-তদবির করছেন বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে এ আসনের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে এ পর্যন্ত চারজন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেন। আরো কয়েকজন মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। তার জন্য বৃহস্পতিবার মনোনয়ন ফরম জমার শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে সব সমীকরণ উল্টে যেতে পারে যদি এরশাদ ও রওশন দম্পতির একমাত্র সন্তান সাদকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। তার মা দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ চাইছেন নিজের ছেলেকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসতে। এরশাদের জীবদ্দশায় সেভাবে সামনে না এলেও এখন মায়ের সব অনুষ্ঠানেই সাদকে পাশে দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির যুগ্ম দফতর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক খান বলেন, আমরাও স্যারের ছেলের বিষয়ে শুনেছি। তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করবেন। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সাদ এরশাদের মনোনয়নের বিষয়টি নিয়ে জাপার ভেতরে জোর আলোচনা চললেও মুখ খুলতে নারাজ দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। দলের মনোনয় বোর্ড করা হয়েছে- বিষয়টি নিয়ে বোর্ডই সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রার্থিতা বিষয়ে ইয়াসির বলেন, আমি বহু দিন ধরে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করছি। গত নির্বাচনে স্যার (এরশাদ) অসুস্থ থাকায় তার হয়ে আমি নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি। যে পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে রংপুর সদর উপজেলা গঠিত, সেসব ইউনিয়নে আমার সমর্থন রয়েছে। আমার পক্ষে রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩২ জন কাউন্সিলরের সমর্থনও রয়েছে।
অতীতে দেখা গেছে, রংপুর-৩ আসনে এরশাদ প্রার্থী হওয়ায় আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছে। তবে এবার প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায়, এই আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও প্রার্থী দেবে, ফলে বিপাকে পড়তে পারে জাপা। যদিও এটা মানতে নারাজ ইয়াসির। রংপুরকে জাতীয় পার্টির ‘শক্ত ঘাঁটি’ দাবি করে ইয়াসির বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো সুবিধা করতে পারবে না। ভোটের মাঠে কোনো গণ্ডগোল না হলে রংপুরে আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির পার্থক্য আরো বড় হয়ে দেখা দেবে।
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর ফরম তুললেও দল থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, আমি ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করছি। এখন এই উপনির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেতে আরো অনেকে ফরম কিনেছেন। আমি শেষ অবধি মনোনয়ন পাবো কি না, জানি না। দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে আমার কাজের প্রমাণ আছে। এখন তাদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে আমার মনোনয়ন। এর আগে জাহাঙ্গীর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসন থেকে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
এ দিকে মনোনয়ন ফরম তুলে চমক দেখিয়েছেন এরশাদের ভাগ্নি মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পা। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ফ্যাকাল্টির পরিচালক টুম্পা কিছু দিন আগেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। দলের চেয়ারম্যান পদ পাওয়ার পর জি এম কাদের তাকে নীলফামারী জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটির কার্যকরী সদস্য পদ দিয়েছেন। এরশাদের বোন মেরিনা রহমানের মেয়ে টুম্পা। মেরিনা দশম জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন। টুম্পার স্বামী জিয়াউদ্দিন বাবলু জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যিনি ডাকসুর জিএস থাকাবস্থায় এরশাদের মন্ত্রিসভায় শিক্ষা উপমন্ত্রী ও পরে জালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন।
মনোনয়নপ্রাপ্তির ব্যাপারে আশাবাদী মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পা বলেন, শিক্ষকতার মাধ্যমে আমি এতদিন দেশসেবা করেছি। এবার আমি জনপ্রতিনিধি হয়ে দেশের সেবা করতে চাই। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। টুম্পার ভাই ও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আদেলুর রহমান আদেল এখন নীলফামারী-৪ আসনে দলের সংসদ সদস্য। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকও এরশাদের আসনটি থেকে দলের প্রার্থী হতে চান বলে জানিয়েছে জাতীয় পার্টির দফতর বিভাগ।
এ উপনির্বাচনে জাপার দলীয় মনোনয়নপত্রের মূল্য ধরা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। পরদিন শুক্রবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে। দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই বাছাই, সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রার্থী চূড়ান্তকরণে জাতীয় পার্টি ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করেছে।
নির্বাচন কমিশন রংপুর-৩ আসনে আগামী ৫ অক্টোবর ভোটগ্রহণের দিন ঠিক করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বাছাই ১১ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৬ সেপ্টেম্বর।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে রংপুর সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের সিদ্দিক হোসেন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জয় পান বিএনপির রেজাউল হক সরকার রানা। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুল গণি স্বপন জেতার পর থেকে এই আসনটি আর কখনো হাতছাড়া হয়নি। ১৯৮৮ সালে মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ২০০১ সালে জি এম কাদের, ২০০৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ২০০৯-এ (উপনির্বাচন) রওশন এরশাদ, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই আসনে নির্বাচিত হন।
উল্লেখ্য, একাদশ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ ৯০ বছর বয়সে ১৪ জুলাই মারা যান। তার মৃত্যুতে রংপুর-৩ আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। রংপুর সদর উপজেলা এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ১-৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়া বাকি এলাকা নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪১ হাজার ৬৭৩ জন। এই আসনে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র ১৩০টি, ভোটকক্ষ ৯১০টি। রংপুর-৩ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে বলে ইতোমধ্যে ইসি জানিয়েছে।



