পদ্মায় অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজবাড়ী সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক ও চরধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের ২টি ভবন, মসজিদসহ শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড গত ২ মাসে ৯০ লাখ টাকা ব্যায় করে ১৮ লাখ বালু ভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ডাম্বিং করেও ওই স্কুল ভবন ২টি রক্ষা করতে পারে নাই।
এ স্কুলের বাকি ভবনটিও এখন নদীর পাড় শতভাগ ভাঙ্গণ ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা ফেলে এখনো ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবণটিতে শিশু ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া হতো। আজ শ্রক্রবার স্কুলটির দুটি ভবনের টিনসেড ভবনের একাংশের দেয়াল ধসে গেছে। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ ভবনটির অবশিষ্ট অংশ ভেঙে সড়িয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেন।
এর দুই দিন আগে বিদ্যালয়ের পাশের একটি মসজিদসহ শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে একটি স্কুল ভবন, একটি মসজিদসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি স্থাপনা বিলীন হয়ে ভয়াবহ ভাঙ্গণ অব্যাহত রয়েছে।
পদ্মার পানি বৃদ্ধিতে রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধের গোদার বাজার পয়েন্টে প্রায় ৬০ মিটার ধসে গেছে। সে জায়গাও পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গণ রোধের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্কুলটি রক্ষায় ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বালুর বস্তা ফেলার কাজ শুরু করেছেন। তবে নদীর গতিপথ ও তীব্র স্রোতে ঘূর্ণয় তৈরি হওয়ায় এ ধস দেখা দিয়েছে বলে দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের। ভাঙনরোধে তারা বালু ভর্তি বস্তা জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত কয়েকদিনে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র স্রোত দেখা দেয়ায় সদর উপজেলার মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোদার বাজার নদীর তীর রক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ ও অন্তারমোড় এলাকায় ভাঙ্গণ দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গণ হুমকিতে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। পানি উন্নয়ন বোর্ড মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোদার বাজার এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গণরোধে কাজ করছে।
এর আগে আগস্ট মাসে এই তিনটি উপজেলায় একটি মাদরাসা, পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি, ব্রিজ-কালভার্টফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়।
রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসনে আরা করিমি শুক্রবার মহাদেবপুর স্কুল নদীতে চলে যাবার দৃশ্য দেখেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান,এখনো পদ্মা ভয়াবহ ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে জেলার চরাঞ্চলের আটটি স্কুল।এর আগে গত ২ বছরে এ জেলার পদ্মা পাড়ের আরো ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবণ নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা পাশের কোন বাড়ির ওঠানে ক্লাস করছে। জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাঙ্গণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে প্রথম দফা আগস্টে জেলার বেরী বাঁধের সাড়ে ১১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিভিন্ন অংশে ভাঙ্গণ দেখা দেয়। বিভিন্ন অংশে ধ্বসে যায়। মিজানপুর, দৌলতদিয়া, দেগ্রাম ও বরাট এই চারটি ইউনিয়নে ব্যাপক নদী ভাঙ্গণ দেখা দেয়। সে দফায় একটি মাদরাসা,মসজিদ, পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি, ব্রিজ-কালভার্ট, ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়। আবারো দ্বিতীয় দফা ভাঙনে শুক্রবার সকালে মিজানপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বিদ্যালয়ের ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একই সাথে পদ্মা পাড়ের আরো ৬/৭টি স্কুল ভবণ ভাঙ্গণ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বছর দ্বিতীয় দফায় পানি বৃদ্বির ফলে গত এক সপ্তাহে জেলার ৪ উপজেলায় পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
এখনো ভাঙ্গণ মুখে রয়েছে ৬/৭টি স্কুল ভবণসহ ৭টি স্কুল, দু’টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র-কমিউনিটি ক্লিনিক, হাটবাজারসহ তিন ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, হাজারো বসতবাড়ি।
তাৎক্ষণিক নির্দেশে পদ্মা নদীর ডান তীরের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করলে ভাঙনের গতিবেগ কমে আসছে। কিন্তু গত কয়েক দিনের অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে তীব্র স্রোতের তোড়ে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুই দফা পানি বৃদ্বি ও ভাঙনে চরাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়নের সহশ্রাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্র¯Í হয়েছে। ভাঙনকবলিতরা ঘরবাড়ি নিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বি¯Íীর্ণ জনপদ।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে তীব্র স্রোত থাকায় ভাঙন এলাকা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিলীন হওয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া যাতে বন্ধ না হয় তার বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে।
জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় প্রচন্ড স্রোত রয়েছে। ভাঙনের গতিও ভয়াবহ। নদীতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এছাড়ও আকর্ষিক বন্যায় রাজবাড়ীতে বন্যায় তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির মাষকলাইসহ শীত কালিন আগাম স্বব্জি।হঠাৎ্ রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্বিতে বন্যার কারণে ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অন্যদিকে পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির মাষকলাই। এতে কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাংশা, কালুখালি, গোয়ালন্দ ও সদর উপজেলার হাবাসপুর, বাহাদুরপুর, কালিকাপুর, রতনদিয়া, মিজানপুর, খানগঞ্জ, চন্দনী, বরাট, ছোচভাকলা, দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ২০/২৫ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ইতিমধ্যে জেলার ৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কালুখালি উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের কৃষক নাদের আলি জানান, আমার সাত বিঘা জমিতে মাষকলাই বপন করেছিলাম। আকস্মিক বন্যায় সবই তলিয়ে গেছে। হাবাসপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর ইউনিয়নের হুমায়ন, হাসানপুরের হাসান আলিসহ আরো অনেকেই জানান, তাদের মাষকলাই খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।



