এবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বারি-১ জাতের মাল্টা (কয়েন মাল্টা) চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের আত্মপ্রত্যয়ী যুবক সজল সরকার। এর আগে ইরি-বোরো ধান চাষ, হাড়িভাঙ্গা আম চাষ, নানা জাতের মাছের চাষ ও মুরগি পালন করে একের পর এক সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এসেছেন তিনি। এবার তিনি নিজের মাছের ঘেরের পাড়ে বারি-১ জাতের চাষ করে দারুণ সাফল্য অর্জন করে চারদিকে বেশ সাড়া ফেলেছেন।
জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর এলাকার একটি নার্সারি থেকে ২০১৬ সালে বারি মাল্টা-১ এর ৭০টি চারা সংগ্রহ করেন সজল সরকার। মাছের ঘেরের পাড়ে চারাগুলো রোপণ করে কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে তিনি এগুলোর সঠিক পরিচর্যা চালিয়ে যান। মাত্র আড়াই বছরের মাথায় এসে প্রতিটি গাছে ফুল আসে এবং ফল ধরতে শুরু করে। প্রথমবারেই তার ৭০টি গাছে ১২ মনেরও বেশি মাল্টা ধরেছে। ইতোমধ্যে তিনি পাঁচ মণের বেশি মাল্টা বিক্রি করেছেন। বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনকে উপহার দিয়েছে দুই মণের বেশি মাল্টা। এখনো তার বাগানের গাছে পাঁচ মণের বেশি মাল্টা রয়েছে। মাল্টার চারা কেনা, রোপণ ও পরিচর্যা করতে গিয়ে সার, ওষুধ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন খরচ বাবদ তার প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রথমবারেই যে পরিমাণ ফল ধরেছে তা থেকে বিনামূল্যে বিতরণের পরও তিনি ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তার গাছের মাল্টাগুলো বেশ রসালো ও খুব মিষ্টি। এ কারণে তিনি মাল্টা তুলে পার্শ¦বর্তী মাহিলাড়া বাজারের ফলের দোকানে দেয়া মাত্রই সেগুলো বিক্রি হয়ে যায়।
সরেজমিন সজল সরকারের মাল্টা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, তার বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় মাল্টা ঝুলে আছে। যার নান্দনিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীদের।
এ সময় আলাপকালে সফল চাষি সজল সরকার জানান, প্রথম বছরেই তার বাগানে এত ফলন আসবে সেটা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় ১৪ একর জমিজুড়ে রয়েছে তাদের বাড়ি, ফলের বাগান, পোলট্রি ফার্ম ও মাছের ঘের। তিনি ও তার বড় ভাই মিলে পৈর্তৃক মাছের ঘের থেকে বছরে বিভিন্ন জাতের ৮০০ থেকে এক হাজার মণ মাছ উৎপাদন করেন। পাশাপাশি তার ১৩ শ’ মুরগি পালনের একটি পোলট্রি খামার রয়েছে। ইতঃপূর্বে ওই পোলট্রি খামারে পালিত মুরগি থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২ শ’ ডিম পেতেন। কয়েক মাস আগে মুরগিগুলো ডিম দেয়া শেষ করলে তিনি খামারের সব মুরগি বিক্রি করে দেন। এখন খামারে ১৩ শ’ লেয়ার মুরগির বাচ্চা রয়েছে। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে তারা ডিম দিতে শুরু করবে।
গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, পাহাড়ি অঞ্চলের ফল হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৩ সালে সমতল অঞ্চলে চাষের উপযোগী করে বারি-১ জাতের মাল্টার এ জাতটি উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করে। বারি-১ জাতের মাল্টাটি উচ্চ ফলনশীল ও নিয়মিত ফলদানকারী ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ একটি ফল। পাকা ফল দেখতে বেশ আকর্ষণীয় এবং খেতেও সুস্বাদু। ফল্গুন মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ মাল্টা গাছে ফুল ধরা শুরু করে। এরপর ফুল থেকে ফল হয় এবং আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফল পাকতে শুরু করে। প্রথমপর্যায়ে প্রতিটি গাছে ৩০ থেকে ৫০টি এবং পূর্ণাঙ্গ বয়সে দেড় শ’ থেকে দুই শ’ ফল ধরে। আর হেক্টর প্রতি এর ফলন হয় প্রায় ২০ মেট্রিক টন। মাল্টা চাষে অল্প খরচে অধিক লাভ করা সম্ভব। সফল চাষি সজল সরকারের মতো এ অঞ্চলের চাষিরা যদি মাল্টা চাষে এগিয়ে আসেন তা হলে এক দিকে যেমন দেশের বাজারে বিদেশ থেকে আনা মাল্টার আমদানি কমে আসবে, অন্য দিকে আমরা বিষমুক্ত দেশীয় মাল্টা খাওয়ার সুযোগ পাবো।