বগুড়ার শাজাহানপুরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ভূমিদস্যুরা। তাদের দৌরাত্ম্যে কৃষি উর্বর জমিগুলো একের পর এক ডোবা-নালা ও গর্তে পরিণত হচ্ছে। ফলে এক দিকে যেমন আবাদি জমি কমে যাচ্ছে অন্য দিকে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা, খোট্রাপাড়া, মাঝিড়া ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের কৃষি উর্বর জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) আবার কোথাও কৃষিজমির মাটি গভীর গর্ত করে স্কেভেটর দিয়ে তুলে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন ইটভাটাগুলোতে বিক্রি করছে। এতে করে এরই মধ্যে খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের জালশুকা ও চান্দাইএলাকার আবাদি জমিগুলো বিশাল বিলে পরিণত হয়েছে এবং মাদলা, মালিপাড়া, জালশুকা, চান্দাই, সাজাপুর, বেলপুকুর, ডুমুনপুকুর, চকজোড়া, খলিশাকান্দি, দুবলাগাড়ি, দুরুলিয়া, ঘাষিড়া, পারতেখুর, ফটকি, জামুন্না ও দাড়িগাছা এলাকার কৃষিজমিগুলো বড় বড় গর্ত ডোবা-নালা পুকুর ও জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ফসলি জমির মাটির টপ সয়েল কাটার কারণে ধীরে ধীরে জমিগুলো উর্বরাশক্তি হারিয়ে ফেলছে। শত শত একর জমি ডোবা-নালা হওয়ার কারণে কৃষিজমি বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে এবং অবৈধভাবে নদী ও খাল থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ভেঙে যাচ্ছে নদী পাড়ের কৃষিজমি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, বিশাল অঙ্কের টাকার লোভে ভূমিদস্যুরা ক্ষতিকর এসব কাজ করছেন। তারা বুঝতে পারছে না যে, ভবিষ্যতে এ জমি পরিত্যক্ত হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া জমির হারানো পুষ্টি ফিরে পেতেও ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগবে। জমির উপরিভাগের চার-ছয় ইঞ্চি মাটিতেই মূলত বেশি পুষ্টি থাকে, যা ফসল উৎপাদনে সহায়ক। তিনি আরো বলেন, এ উপজেলার কৃষিজমিগুলো অত্যন্ত উর্বর। অল্প খরচে প্রচুর শস্য উৎপাদন হয়। ফলে সারা বছর এ উপজেলা থেকে খাদ্যশস্য ও প্রতিদিন শত শত ট্রাকে বেগুন, মরিচ, আলুসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্য ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায় এবং দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু বর্তমানে এ এলাকায় কৃষিজমিগুলো একের পর এক বিলুপ্ত হতে চলেছে। সঙ্গত কারণে ফসল উৎপাদন কমে গেছে। কারণ হিসেবে আরো জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অভ্যন্তরে, আবাদি জমিতে ও স্কুল-কলেজের আশপাশে অনুমোদনবিহীন ইটভাটা রয়েছে শতাধিক। এসব ইটভাটায় মাটি সরবরাহের জন্য মালিক ও সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এসব আবাদি জমির টপ সয়েল (উর্বর মাটি) এবং কৃষিজমির মাটি গভীর করে স্কেভেটর দিয়ে কেটে দেদার নিয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসী জানান, এসব বিষয়ে বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয় না; বরং কেউ বাধা দিতে গেলে তাদেরকে জীবননাশের হুমকি দেয়া হয়। বিধায় ভূমিদস্যুদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে উপজেলার কৃষি ও কৃষক। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর দায়সারা লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা পারভীন বলেন, ‘অভিযান যখন পরিচালনা করা হয় তখন তাদেরকে পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে কী করার আছে? তা হলে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কাছে প্রশাসন ব্যর্থ কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাদের অসুবিধা হচ্ছে তারা আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।’ এমন নীরবতার সুযোগে এক দিকে উর্বর কৃষিজমিগুলো ডোবা-নালা গর্ত আর বিল হচ্ছে। আরেক দিকে অবৈধ ইটভাটার অগ্নিশিখায় ফসলহানি হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এবং গ্রামের অভ্যন্তরে গাছপালা ও বাগান উজাড় করে প্রতিদিন স্কেভেটর দিয়ে জমিগুলো গভীর করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটায়। তাই সবার চোখের সামনে এসব ঘটলেও প্রশাসনের দৃষ্টিতে পড়ছে না এবং এসব ভূমিদস্যুকে ধরতে কেন পারছেন না এমন প্রশ্ন মাথাচাড়া দিলেও উত্তর মিলাতে পারছে না কেউই। তাই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
শুধু তা-ই নয়, মাটি বহনকারী শত শত ডাম্পার চলাচলের কারণে উপজেলার বেশির ভাগ পাকা সড়ক ধসে গেছে। এমনকি সড়কের ওপর বিছানো ইট ভেঙে ধুলাবালুতে একাকার ও তছনছ হয়ে গেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাকা সড়কগুলো চোখের সামনে গচ্ছা গেলেও দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধ নেই কর্তাদের।
পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যমতে, শাজাহানপুর উপজেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৬ হাজার ১৮০ হেক্টর। ইউনিয়নের সংখ্যা ৯টি। আর ইটভাটার সংখ্যা শতাধিক।



