রাজবাড়ী-মাগুরা দুই জেলার আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি আজো হয়নি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম। একই সাথে সীমানা সংলগ্ন স্থানে জরিপ কাজ বন্ধ ও চিহ্নিহ্নত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান স্থিতাবস্থা অবস্থা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় কয়েকটি মৌজার জরিপ কাজও শেষ হয়নি। জমির প্রকৃত মালিকরা তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে না। দুই জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটছে। এ বিরোধ নিষ্পত্তি হবে কবেÑ প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
জানা গেছে, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি, পাংশা ও কালুখালী উপজেলা এবং মাগুরা জেলার শ্রীপুর ও শৈলকুপা উপজেলার গড়াই নদীর আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে অধিদফতরের তৎকালীন মহাপরিচালক আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে দুই জেলার সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জানা যায়, রাজবাড়ীর নবগঠিত কালুখালী উপজেলার ঘাটরা মৌজার সাথে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার মৌজার সীমানা নিয়েই আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ। বিরোধীয় এলাকা দিয়ে গড়াই নদী প্রবাহিত। সিএস জরিপে গড়াই নদীর মধ্যস্রোতকে উভয় জেলার আন্তঃজেলা সীমানা হিসেবে গণ্য করা হয়। পরে আরএস জরিপের সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ফরিদপুর জোন কর্তৃক আরএস জরিপের সময় পরিবর্তনশীল নদীর মধ্যস্রোতকে আন্তঃজেলা সীমানা ধরে জরিপ করলে এবং নদী সিকস্তি ও পয়স্তির ফলে সীমানা বিরোধের সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া মৌজার সাথে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মহেষপুর মৌজার বিরোধই আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ। বিরোধীয় এলাকা দিয়ে গড়াই নদী প্রবাহিত। সিএস জরিপে গড়াই নদীর মধ্যস্রোতকে উভয় জেলার সীমানা হিসেবে গণ্য করা হয়। পরে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ফরিদপুর জোন কর্তৃক আরএস জরিপের সময় পরিবর্তনশীল নদীর মধ্যস্রোতকে আন্তঃজেলা সীমানা ধরে জরিপ করলে নদীর সিকস্তি ও পয়স্তির ফলে সীমানা বিরোধের সৃষ্টি হয়। পাংশা উপজেলাধীন জামালপুর মৌজার সাথে শ্রীপুর উপজেলার চাকদাহ মৌজার সীমানা বিরোধ রয়েছে। আরএস জরিপের সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ফরিদপুর জোন কর্তৃক ১৯২৮-৩২ সালে পেটি জরিপ হয়। পেটি জরিপের সময় পরিবর্তনশীল নদীর মধ্যস্রোতকে আন্তঃজেলা সীমানা ধরে জরিপ করলে এবং সিকস্তি ও পয়স্তির ফলে সীমানা বিরোধের সৃষ্টি হয়। এ বিরোধীয় এলাকায় অধিদফতর থেকে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগ করে পেটি জরিপ করা হয়েছে।
দুই জেলার জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক ও ভূমি কর্মকর্তাদের মতে, নদী পরিবর্তনশীল। এ বছর নদী এখানে তো পরের বছর নদী ওইখানে। এ অবস্থায় নদীর মধ্যস্রোতকে সীমানা ধরা যুক্তিসঙ্গত নয়। নদীর মধ্যস্রোতকে সীমানা ধরে জেলার সীমানা নির্ধারণ করা হলে নদী পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতি বছর সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি বছর নদীর মধ্যস্রোতকে সীমানা হিসেবে গণ্য করা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু সর্বত্র সিএস জরিপ হয়েছে তাই সিএস জরিপ অনুযায়ী বিরোধীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে স্থানীয় জনগণের বিশেষ মতামত নেয়া প্রয়োজন।
১৯৭৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ঘাটরা ও আমলসা মৌজা সংক্রান্ত আরএস নকশা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। আবার ১৯৯৪ সালের ২৫ আগস্ট আরএস নকশা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্ট এবং ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল একই সিদ্ধান্ত হয়। এভাবে একই বিষয়ে বারবার সভা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া মোটেই সমীচীন নয়। এমন একটি সিদ্ধান্ত হওয়া প্রয়োজন যা দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বজন গৃহীত হয়। একটি কমিটি গঠন করে সরেজমিন স্থানীয় জনগণের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
২০১১ সালের ১২ এপ্রিল সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিরোধীয় মৌজার জরিপের সব কাজ শেষ করে চূড়ান্ত প্রিন্ট হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এ এলাকার বিরোধের ক্ষেত্রেও একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
রাজবাড়ীর এলাকার জনগণ সিএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করার জন্য হট্টগোল শুরু করলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের মৌখিক নির্দেশে কাজটি স্থগিত করা হয়। ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সীমানা নির্ধারণের মাঠের কাজ সম্পন্ন করে পিলার পজিশন দিতে গেলে স্থানীয় জনগণ সিএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করার দাবি জানান। অধিদফতর থেকে পিলার নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ পেয়ে পিলার তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু জনগণ না মানায় পিলার বসানো সম্ভব হয়নি। ১৯২৮-৩২ সালে পেটি জরিপ অনুযায়ী বর্তমান রাজবাড়ী জেলা থেকে এ সব মৌজার জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। পেটি জরিপ অনুযায়ী উভয় জেলার সীমানাকে বহাল রাখার অনুরোধ করা হয়। পেটি জরিপ অনুযায়ী এ বিরোধীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ সমস্যা ইতঃপূর্বেও সমাধান করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের ২৫ আগস্ট আরএস নকশা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হলে এলাকার জনগণ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিধায় সিএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের জন্য জোরালো দাবি জানানো হয়।
তবে কাগজেকলমে ২০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হলেও তাদের কোনো কার্যক্রম লক্ষ করা যায়নি। ফলে আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি ঝুলে আছে বছরের পর বছর। কবে হবে এ নিষ্পত্তি সে দিকে তাকিয়ে আছেন দুই জেলার ভূমি মালিকরা। তারা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।