জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাসায় হামলার ঘটনার সাথে জড়িতদের সনাক্তে এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিএনপির নেতাদের সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে আড়াই ঘণ্টার ভিন্নরকম এক রংপুর দেখলো নগরবাসী। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গভীর রাতে সেখানে এনসিপি নেতা সারজিস আলমের উপস্থিতি ঘটনাকে আরো বাড়তি মাত্রা দেয়। দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে নেতারা চলে গেলে সেনাবাহিনীও নগরীর ঐতিহাসিক পায়রা চত্বর ছাড়ে। এ ঘটনা শনিবার রাতে পৌনে ১২টা থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘটনা শুরু শনিবার (৩১ মে) রাত পৌনে ১২ টার দিকে। এর আধাঘণ্টা আগে এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা ও মহানগর আহবায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি ও ইমরান আহমেদের নেতৃত্বে কোতয়ালি থানায় বৃহস্পতিবার (২৯ মে) তাদের মিছিলে হামলার অভিযোগ এনে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ ১৮ নেতার নামে এজাহার দায়ের করেন। বাদি হন এনসিপি জেলা ও মহানগর সংগঠক আলমগীর নয়ন।

থানা থেকে বেরিয়ে টাউন হল মাঠের দিকে গেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর আহবায়ক ইমতিয়াজ আমহেদ ইমতি ও জেলা আহবায়ক ইমরান আহমেদের মোবাইল ফোনে কল যায় সেনাবাহিনীর ৭২ বিগ্রেড কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুনের। কলের সূত্র ধরে ইমরান-ইমতি নগরীর পায়রা চত্বরে আসা মাত্রই সেনাবাহিনীর জেরার মুখে পড়েন তারা। সেখানে বিপুল পরিমান সেনাসদস্য অবস্থান নেন। এ সময় পায়রা চত্বর দিয়ে সকল ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন সেনা সদস্যরা। এ ঘটনায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে ইমতি-ইমরানকে আটকের খবর।

Rangpur-Sarjis

পায়রা চত্বরে সেনাবাহিনীর নজরদারিতে থাকা অবস্থাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওই দুই নেতা কথা বলেন গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে।

রংপুর মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি এ সময় বলেন, আমরা থানায় এজাহার দায়েরের পর যাচ্ছিলাম। তখন ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল স্যার ফোন করে দেখা করতে বলেন। এরপর পায়রা চত্বরে তিনি আমাদের সাথে দেখা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করেন। আমাদের কাছে ভিডিও দেখিয়ে বৃহস্পতিবারের হামলাকারীদের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়। সেদিন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের হাতে অস্ত্র ঝম ঝম করছিল। সেটা ভিডিওতে দেখা যায়। আমাদের হাতে কিছু ছিল না। স্টুডেন্টরা কখনই সহিংসতার পক্ষে না। আমরা নিজেরাও এ ধরণের কোনো কাজের সাখে সম্পৃক্ত না। তৃতীয় কারা ঢুকেছে, কিভাবে ঢুকেছে। এটাও আমাদের অজানা। আমাদের ওপর যারা প্রথম হামলা করলো, যাদের হাতে অস্ত্র ছিল। এ মানুষগুলোকে সনাক্ত করা হোক। আমরাও যদি কাউকে চিনে থাকি। সেটাও আমরা স্যারদের দিয়ে সহযোগিতা করবো, তাদের সাথে কো-অপারেট করবো।

ইমতি আরো বলেন, ‘কারা হামলা চালিয়েছে, কারা আগুন দিয়েছে তাদের বিষয়ে আমাদের সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমরা আমাদের দিক থেকে ক্লিয়ার যে আমরা এ ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত নই। আমাদেরকে যে ভিডিও দেখানো হয়েছে, তাতে কারো হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তাদের আমরা চিনি বলে জানিয়েছি। তারা কেউ আমাদের ছোট ভাই, কেউ সমবয়সি। ‘

রংপুর জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘তারা আমাদের মোবাইল ফোনে ডেকে এনে এখানে ভিডিও দেখিয়ে হেল্প চেয়েছেন তাদেরকে আমরা চিনি কিনা। কিন্তু ওখানে অনেক লোক আছে যাদের আমরা চিনি না। আমাদের একটা শান্তিপূর্ণ মিছিল ছিল। ওই মিছিলে তারা হামলা চালিয়েছে ‘

এ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে রেখেই মোবাইল ফোনে ডাকা হয় মহানগর আহবায়ক সামসুজ্জামান সামু, সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন ও আনিছুর রহমান লাকুকে। তাদের সবাইকে বৃহস্পতিবার (২৯ মে) জিএম কাদেরের বাসায় হামলার ভিডিও দেখিয়ে সনাক্ত এবং তাদেরকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার শর্ত দেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে রংপুর মহানগর বিএনপি সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন জানান, যে কোনো একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা কিছুদিন আগে ঘটেছে। এর সাথে আসলে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। ওনারা আমাদের ডেকেছিলেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আমরা গভীরভাবে পর্যক্ষেণ করবো। সংগঠনের কেউ যদি এ ধরণের ঘটনার সাথে জড়িত থাকে তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিবো।

রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব, সামসুজ্জামান সামু বলেন, আমাকে ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন সাহেব ফোন করে পায়রা চত্বরে ডাকেন। তখন আমি অফিসে ছিলাম। আমি যাওয়ার পর ডন, লাকু সেখানে আসেন। আমি আসার পর উনি জিজ্ঞাসাবাদ করলেন পরশু দিনের (বৃহস্পতিবারের) ঘটনার সাথে কারা কারা জড়িত আছে। আপনি জানেন কি না। তখন আমি তাকে বলি এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তখন উনি আমাকে ভিডিও দেখালেন। তাতে আমার দলের একজন পরিচিত বের হলো। ভিডিওতে একটা বাচ্চা ছেলে নাম রোমিও হতে পারে। তখন উনি আমাদের কাছে সহযোগিতা চান। ইমতি ইমরান আমার আগে এসেছে। আমি এসে ওদেরকে পাই। আমার পরে ডন ভাই লাকু ভাইরা আসছে। আমরা তাদের সাথে কথা বলি। ওনারা আমাদের কাছে সহযোগিতা চাচ্ছে। আমরাও সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত আছি। তবে অনেক সময় অনেক কিছু ইচ্ছে করলেই করা যায় না। তারপরেও আমরা ওনাদেরকে সহযোগিতা করে রংপুরের আইনশৃঙ্খলা যাতে ভালো থাকে সেজন্য একসাথে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ। দ

এদিকে এ ঘটনা জানাজানি হলে রাত পৌনে ১টায় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তাতে তিনি লেখেন, ‘রংপুরে ফ্যাসিস্টদের দোসরদের গ্রেফতার না করে অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদেরকে বিব্রত করলে আগামীকাল রংপুরের রাজপথে আবার দেখা হবে। আর আমরা সেখানে সামনের সারিতে থাকবো।”

এরই মধ্যে আসে তুমুল বৃষ্টি। সেনাকর্মকর্তা ইমতি-ইমরানকে নিয়ে বাটার দোকানের নিচে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখেন। রাত সোয়া ১টায় সেখানে হঠাৎ হাজির হন এনসিপি নেতা সারজিস আলম ও আসাদুল্লাহ আল গালিব। প্রায় ৪০ মিনিট সেনাকর্মকর্তার সাথে কথা বলেন তারা। এক পর্যায়ে জুলাই বিপ্লবীদের বিব্রত করা হচ্ছে দাবি করে এক নেতা বক্তব্য রাখলে ‘হু আর ইউ বলে’ তার পরিচয় জানতে চান ওই কর্মকর্তা। এরপর সারজিসের সাথে কথা হয় ব্রিগ্রেডিয়ার হুমায়ুনের। রাত ২টা ২০ মিনিটে গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন সারজিস আলম ও সামসুজ্জামান সামু। তারা এভাবে গভীর রাতে ডেকে নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করাকে ‘বিব্রতকর অবস্থা’ বলে দাবি করেন।

সারজিস আলম বলেন, আমি পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টির কারণে গাড়ি ধীরে ধীরে যাচ্ছিল। তখন আমি রংপুর ক্রস করছি মাত্র। ওই মুহূর্তে আমি কোনোভাবে জানতে পারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টিমের সাথে এখানকার বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং আমাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা ও মহানগর আহবায়ককে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তখন আমি গাড়ি ঘুড়িয়ে পায়রা চত্বরে আসি।

সারজিস আলম আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সম্মান শ্রদ্ধা রেখেই বলছি ওই বিষয়ে তদন্তের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হোক বা, বিএনপি জামায়াত বা এনসিপির যে কাউকে হোক তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা মনে করি রাত ১টা ২টার সময় এটা আসলে ভালো দেখায় না। ওই সময়টায় দৃষ্টিকটু দেখায়। বরং আমরা প্রত্যাশা করি তাদেরকে যদি যে কোনো টাইমে দিনের বেলা অফিস আওয়ারে ডাকা। তখন সবাই প্রস্তুত থাকবে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য। সো আমাদের জায়গা থেকে এটুকুই প্রত্যাশা থাকবে জাতীয় পার্টির সাথে ঘটনার শুরু থেকে কনসিকুয়ান্স টানার জন্য। সে অনুযায়ী কাজ করার জন্য। দ্বিতীয় প্রত্যাশা থাকবে এই সময় সার্বিক সিচ্যুয়েশনটা যেন এমন না হয় যে বিব্রতকর পরিস্থিতি ফেলে। যেকারণে আমাদের যে যাত্রা সেই যাত্রা পথে ব্যাঘাত ঘটে।’

আলোচনার এক পর্যায়ে সারজিসকে রাতের খাবারের অফার করেন সেনাকর্মকর্তা হুমায়ুন। তখন সবাইকে হাসিমুখে দেখা যায়। পরে সারজিস সবাইকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে চলে যান।

Rangpur-NCP

তার আগে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন, সেনাকর্মকর্তা ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে সব কিছু করতে প্রস্তুত। সেটাই আমরা রংপুরে করে যাচ্ছি। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যেটা যাবে সেটা দলমত নির্বিশেষে যারা খারাপ কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান খুবই কঠোর। কোনো কারণেই মানুষের ক্ষতি হয়, ভ্যান্ডালিজম করা, কোনো কিছু ভেঙ্গে ফেলার কোনো অবকাশ আমাদের অবস্থানকালীন সময়ে নেই।

ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন বলেন, ‘ওনারা সবাই বলেছেন আমাদেরকে সহায়তা করবেন। ওনারা ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন, ছবি দেখেছেন। তারা আইডেনটিফাই করতে পেরেছেন। কেউ কেউ আছে তাদের দলের। যাদের হাতে লাঠিসহ অন্যান্য যেসব জিনিস ছিল সেগুলো থাকার কথা ছিল না। তারা বিব্রতবোধ করেছেন। তারা কথা দিয়েছেন আগামীকাল (রোববার) তাদেরকে আমাদের কাছে হাজির করবেন। তারা সরি বলেছে। ভবিষ্যতে তারা এমন কাজ করবে না যাতে রংপুরের শান্তি বিনষ্ট হয়। আমরা সেটাই দেখতে চাই।

সারজিস আলম চলে যাওয়ার সময় এনসিপি ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ঝড়বৃষ্টি আধার রাতে, আছি মোড়া সারজিস ভাইয়ের সাথে শ্লোগান দিয়ে বিদায় দেয়। পরে তারা পায়রা চত্বরে বৃষ্টিতে ভিজে ফটো সেশন করে ও ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে চলে যায়।

বৃহস্পতিবার (২৯ মে) জিএম কাদেরের পৈত্রিক নিবাস রংপুরের স্কাইভিউ বাড়িতে হামলার ঘটনায় জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আরিফ আলী শুক্রবার রাতে বাদী হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৭ নেতাসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত ৫০-৬০ জনের নামে একটি এজাহার দায়ের করেছন। ওই বাড়িটি মরহুম রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পৈত্রিক নিবাস। এর আগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ওই বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল মুক্তিকামী রংপুরের ছাত্র-জনতা। সেই মিছিলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন কিশোর শংকু সমঝদার।

স্কাইভিউতে হামলার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি এজাহার দায়ের হলেও রোববার (১ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত মামলা রেকর্ড হয়নি। তবে জাতীয় পার্টি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ও এনসিপির মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে তা বড় ধরণের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে ধারনা পুলিশের।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী জানান, আমরা উভয় বাদিরই এজাহার গ্রহণ করেছি। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের পরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যাতে আইনশৃঙখলা পরিস্থিতির অবনতি না হয়। সেজন্য আইনশৃঙখলাবাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।