করোনার অবসরে সারা দেশের মত টাঙ্গাইলের নাগরপুরেও চোখ ধাঁধানো ঘুড়ি উৎসব শুরু হয়েছে। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দখিণা হাওয়ায় গ্রামের ঘুড়িপ্রেমীরা দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই রঙিন ঘুড়ি নিয়ে চলে যেতো ফসলের ক্ষেতের পাশে খোলা আকাশে। এখন অফুরন্ত অবসরে শুরু হয়েছে আবারো সেই ঘুড়ি উৎসব। উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়নে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আকাশে ঘুড়ির মেলা বসেছে।

কালের বিবর্তনে গ্রামগঞ্জ এমনকি শহর থেকে হারিয়ে গেছে সেই ঘুড়ি উৎসব। আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ যুবক-কিশোরদের মাঝে এখন আর দেখা মেলেনা আগেরকার সেই ঘুড়ি উৎসব। সারাদিন মোবাইল ফোন আর যান্ত্রিকতা নিয়ে ছুটে বেরানো কিশোর-যুবকেরা। এখন শত বছর পর ফিরে আসা করোনা নামক মহামারী থেকে বাঁচতে সরকারী নির্দেশনার কারণে অনেকটাই ঘরবন্দি সবাই। যুবক-কিশোরদের পাশাপাশি বয়স্করাও রয়েছে হোম কোয়ারেন্টাইনে। তাই যান্ত্রিক জীবনকে ছুটি দিয়ে গ্রীষ্মের বিকেলকে উপভোগ করতে ছোট-বড় সবাই ঘুড়ি নিয়ে ছুটে চলেছেন গ্রামীণ ফসলের মাঠ কিংবা খোলা আকাশে। করোনায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বন্ধু হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে বিভিন্ন রঙ বেরঙের ডানা মেলা বাহারী রঙয়ের ঘুড়ি। এই সুবাদে করোনা আতঙ্কেরে প্রতিটা বিকেল একটু হলেও আনন্দে পার করছেন গ্রামীণ ঐতিহ্য ঘুড়িপ্রেমীরা। ফলে ঘুড়ি বানানোর ধুম পড়েছে। আকাশে চোখ মেললেই ঘুড়ির লড়াইয়ের দৃশ্য!

ঘুড়িপ্রেমীরা জানান, শরৎ, হেমন্তের বিকেলের আকাশ ছেয়ে যেত ঘুড়িতে। আকাশজুড়ে উড়ে বেড়াত নানা রঙের ঘুড়ি। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি রঙের ঘুড়িতে ছেয়ে যেত আকাশ! দেখে মনে হতো, নানা রঙের মেলা বসেছে আকাশজুড়ে। কোনো ঘুড়ি কাটা গেলে মনে হতো রঙের মেলা থেকে যেন একটি রঙ খসে পড়ল। এক সময় ঘুড়ি ওড়ানো আর ঘুড়ি কাটার প্রতিযোগিতার রেওয়াজ ছিল, যা এখন প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তবে পৌষ সংক্রান্তিতে এখনো কোথাও কোথাও ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব হয়ে থাকে। এসব উৎসবে বিভিন্ন প্রকার ঘুড়ি যেমন- চারকোণা আকৃতির বাংলা ঘুড়ি, ড্রাগন, বক্স, মাছরাঙা, ঈগল, ডলফিন, অক্টোপাস, সাপ, কামরাঙা, চরকি লেজ, চিলঘুড়ি, বেত, ডাক, মানুষ ও তারাঘুড়ি, পাল তোলা জাহাজ প্রভৃতি দিয়ে প্রতিযোগীতায় মেটে উঠতো গ্রামীন ঘুড়িপ্রেমীরা।

উপজেলার সহবতপুরের ঘুড়িপ্রেমী তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের পড়াশোনার চাপ না থাকায় তারা বেশিরভাগই ঘুড়ি কিনে উড়িয়ে থাকে। গ্রামে ঘুড়ি তৈরিতে যুবকরা ব্যস্ত সময় পার করছে। তাদের কাছেই এখন মিলছে ঘুড়ি। সাধারণত যেকোনো ডিজাইনের একটি ঘুড়ির দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।

ঘুড়ি বানানো কারিগর শুকুর আলী জানান, এখন প্রচুর পরিমাণে ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে। কারণ করোনাভাইরাসে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশু-কিশোররা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। তাই বিকেলে একটু আনন্দ পেতেই তারা ঘুড়ি উড়াতে মেতে উঠছে। বাশঁ, বেত এবং বিভিন্ন রঙের প্লাস্টিক-কাগজের মোড়কে ঘুড়ি বানানো হয়। আবার কেউ ঘুড়িতে বাতি লাগিয়ে নিয়ে রাতের আকাশে উড়িয়ে থাকে। ঘুড়ি বিক্রি করে সংসারের জন্য কিছু আয় হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ঘুড়িপ্রেমী রওশন আরা মতিয়ার বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, আধুনিক নেটপ্রেমী কিংবা স্মার্টফোনে বুঁদ হওয়া তরুণ প্রজন্মকে মাঠে ফেরাতে দারুণ কাজ করছে ঘুড়ি। সব জায়গায়ই ঘুড়ি ওড়ানো অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। শিশুরা বড় হচ্ছে খাঁচার মধ্যে। ঘরে বসে শিশুরা কম্পিউটার বা ভিডিও গেইম খেলে সময় কাটায়। যারা মাঠে যায়; তারা ফুটবল বা ক্রিকেট খেলে। গ্রামীণ শিশুদের মধ্যেও ক্রিকেট খেলার জোয়ার বয়ে গেছে। এসব খেলার ভীরে ঘুড়ি ওড়ানো খেলা একেবারে বিলীন হয়েছিল প্রায়। তবে এখনকার চিত্র দেখলে মনে হচ্ছে, সেই ঘুড়ি ওড়ানো বিকেলগুলো হয়তো আবার ফিরে এসেছে। গ্রামেগঞ্জে এখন ঘুড়ি উড়ানোর সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। করোনার অবসরে সব বয়সের মানুষ ঘুড়ি উড়াচ্ছে। নীল আকাশে স্নিগ্ধ বিকেলে যেন ঘুড়ির মেলা বসেছে।