নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে নিজঘরে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার প্রধান হোতা যুবলীগ নেতা দেলোয়ারকে মামলার এজাহার থেকে বাদ দেয়ায় সর্বত্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। তিনি ভিকটিম এবং তার পরিবারের সাথে কথা বলেন।
মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (তদন্ত ও অভিযোগ) আল মাহমুদ ফজলুল কবিরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভিকটিমের সাথে কথা বলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেলোয়ার ইতিপূর্বে আরো কয়েকবার ভয়-ভীতি দেখিয়ে ভিকটিমকে ধর্ষণ করেন এবং এ ঘটনা যদি কারো কাছে প্রকাশ করে তাহলে তাদের কাছে থাকা আরো ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দিবে বলে হুমকি দেয়। নিরাপত্তাহীনতার ও ভয়ের কারণে ঘটনার মূল হোতা দেলোয়ারের নাম প্রকাশ করেননি ভিকটিম। আমরা এ ঘটনায় একটি ধর্ষণ মামলা করব।
এদিকে, দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের মাছের খামার থেকে সাতটি ককটেল ও দুটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যায় বেগমগঞ্জের দেলোয়ারের মাছের খামারে র্যাব-১১ এর একটি টিম অভিযান চালায়। এসময় ওই মাছের খামার থেকে সাতটি তাজা ককটেল ও দুটি গুলি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার ওই নারীর সাথে স্বামীর মনোমালিন্য ছিল দীর্ঘদিন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় তিনি বাবার বাড়িতে চলে আসেন। তিনি এক মেয়ে ও এক ছেলের জননী। এক মেয়েকে বিয়ে দেন অপর ছেলে একলাশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র।
একাকিত্বের এ সুযোগে স্থানীয় বাদল ও দেলোয়ারের নেতৃত্বে এলাকার, রহিম, কালাম ও তাদের সহযোগীরা ওই মহিলাকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে ওই গৃহবধূর স্বামী শ্বশুরবাড়িতে আসেন। তারা ঘরে অবস্থান করাকালে স্বামীসহ গৃহবধূকে আটক করে অভিযুক্তরা ব্যাপক নির্যাতন চালায়। তারা স্বামীকে বেঁধে রেখে অবৈধ সম্পর্কের কথা বলে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে। এ সময় তার বিবস্ত্র নির্যাতনের নগ্ন ভিডিও ধারণ করে রাখে নির্যাতনকারীরা।
তার পর থেকে পুরো পরিবারকে অবরুদ্ধ করে তারা। এক পর্যায়ে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করে।
ঘটনার ৩২ দিন পর ৪ অক্টোবর রোববার ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবস্ত্র নির্যাতনের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হলে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের।
নির্যাতনকারীরা সরকারি দলের হওয়ায় ভয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হচ্ছে না। তাই ঘটনার ৩২ দিন অতিবাহিত হলেও ভুক্তভোগী পরিবার এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি। গত রোববার সর্বত্র প্রতিবাদের মুখে পুলিশের সহযোগিতায় নির্যাতিতা বাদী হয়ে রাত ১টায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
বাদী তার এজাহারে উল্লেখ করেন, ঘটনার রাতে অভিযুক্তরা তার ঘরের ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ তার স্বামীকে মারধর করে বেঁধে ফেলে। তাকে পাশের রুমে নিয়ে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে তার পরনের কাপড় খুলে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাদীকে উলঙ্গ করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে এবং শরীরের লজ্জাস্থানে হাত দেয়। পরে অভিযুক্তরা মোবাইল ফোনে কুপ্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ এর ২২ ধারামতে রুজু হয়।
এদিকে ভিকটিম জানান, আমাকে মোবাইল ফোনে কুপ্রস্তাব দেয়া হয় ও পরবর্তীতে দেলোয়ার আমাকে ইয়াবা ব্যবসা করতে বলে। এতে ব্যর্থ হয়ে আমার উপর নির্যাতন চালানো হয় এবং ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হয়। আমার চিৎকার আশপাশের সবাই শুনলেও কেউ ভয়ে এগিয়ে আসেনি। তারা আমাকে হুমকি দিয়ে ভিটেবাড়ি ছাড়া করে।
নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো: আলমগীর হোসেন জানান, গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে এবং নির্যাতিতা পরিবারকে আইনি সহযোগিতা দিতে জেলা পুলিশের পাঁচটি ইউনিট মাঠে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।



