রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় আইন অমান্য করে ইটভাটায় অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। এ ছাড়া ইট তৈরির কাজে কৃষিজমি ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সাথে সমঝোতা করে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। কাঠ কিনে পাল্লা দিয়ে ইট ভাটায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে মোট ১২টি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটাগুলো হলো কেএসপি ব্রিকস, আরকে ব্রিকস, এআরবি বিকস, এ বি এম ব্রিকস (নতুন নাম আরএসবি), এনএসবি ব্রিকস, টিএমবি ব্রিকস (দু’টি), এডি ব্রিকস (দু’টি), রনি ব্রিকস, এমএইচডি ব্রিকস ও হাজী সুপার ব্রিকস। এসব ইটভাটার মধ্যে আতাউর রহমানে এআরবি ব্রিকসের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাকি ইটভাটার মধ্যে চারটি ঝিকঝাক ইটভাটা। এতে কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। কেএসপি ব্রিকস, আরএসবি ব্রিকস, টিএমবি ব্রিকস, এডি ব্রিকস, এমএইচডি ব্রিকস ও হাজী সুপার ব্রিকস ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়।
সরেজমিন ইসলামপুর ইউনিয়নের গণপত্যা, নবাবপুর ইউনিয়নের ইন্দুরদী ও বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের ভীমনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ইটভাটা ঘেঁষে গ্রামীণ পাকা সড়ক। পাকা রাস্তা থেকে হাতের ডান দিকে ইটভাটার অফিস। রাস্তা থেকে কিছু দূর এগোলেই হাতের ডান দিকে স্থায়ী ওজন পরিমাপক যন্ত্র (ওয়েট স্কেল)। অনেকেই কাঠ নিয়ে পোড়ানোর জন্য প্রস্তুত করছে। ভাটার মধ্যে কাঠ জড়ো করে রাখা হয়েছে। পুরোদমে কাঠ পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে।
কয়েকজন শ্রমিকের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রতিদিন হাজিরা হিসেবে কাজ করছেন। এ কারণে কত মণ কাঠ কাটা হয়েছে তার হিসাব রাখা হয় না। তবে মণপ্রতি কাঠের দাম রাখা হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের কাঠ ও গাছের গোড়া মূলত পোড়ানোর জন্য আনা হয়। ইটভাটাটি রাজবাড়ী-বালিয়াকান্দি সড়কের ইসলামপুর ইউনিয়নের গণপত্যা এলাকায় ইটভাটাটি অবস্থিত। ইটভাটা থেকে প্রায় ৫০০ গজের মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাটার তিন পাশ দিয়ে ফসলি জমি। ইটভাটার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পোড়ানোর জন্য কাঠ এনে রাখা হয়েছে। বড় কাঠগুলো কুড়াল দিয়ে চেরাই (পোড়ানোর উপযোগী ছোট ছোট টুকরা) করা হচ্ছে। কেউ কাঠ পরিমাপ করার কাজে ব্যস্ত।
গণপত্যার কেএসপি ইটভাটার মালিক তিনজন। একজন পার্টনার পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি একজন পার্টনার। কাঠ দিয়ে প্রতি বছরই ইট পোড়ানো হয়ে থাকে। প্রশাসনকে আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চাঁদা দিয়ে থাকি।
ইন্দুরদী ইটভাটাটি ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছেন নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, রামদিয়া এলাকায় আমার আরেকটি ইটভাটা রয়েছে। এই ইটভাটা চলতি বছর ভাড়া করেছি। আমরা পরে ইট-কয়লা দিয়ে পোড়াবো। আর জ্বালানি হিসেবে যেসব কাঠ ব্যবহার করা হয় তা কোনো ভালো মানের কাঠ নয়। তা ছাড়া ইটভাটার কারণে অনেক নিম্নমানের কাঠ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়রা কাঠের ভালো দাম পেয়ে উপকৃত হচ্ছে।
ভীমনগর এমএইচ ব্রিকস ভাড়া নেয়া মালিক জিয়াউর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, আমি ফরিদপুরে আছি। সাক্ষাতে কথা বলব।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন (সংশোধিত) অনুসারে আবাসিক, সংরিক্ষত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এসব এলাকা থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।
জ্বালানি কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কে ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কোনো জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন না। ১৬ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৬ বিধান লঙ্ঘন করে ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন তা হলে তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৮ এর উপধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করেন তাহলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৮-এর উপধারা (৩) এর শর্তাবলি লঙ্ঘন করে ইটভাটা স্থাপন করেন তাহলে তিনি অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ১৫ ধারায় বলা আছে যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৫-এর (ক) উপধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করে ইট প্রস্তুত করার করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে তা ব্যবহার করেন বা (খ) উপধারা (২) এর বিধান লঙ্ঘন করে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ব্যতীত ইট প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে মজা পুকুর বা খাল বা বিল বা খাঁড়ি বা দীঘি বা নদ-নদী বা হাওর-বাঁওড় বা চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা হতে মাটি কাটেন বা সংগ্রহ করেন তাহলে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আম্বিয়া বেগম বলেন, ইটভাটাগুলো বেশ আগে থেকেই চলে আসছে। বেশ কিছু ইটভাটা ঝিকঝাক করা হয়েছে। তবে কিছু ভাটা পুরনো পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর যেসব ভাটায় কাঠ পোড়ানো হয় সেগুলোতে মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়। তবে এ বছর এখনো ইটভাটায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়নি। দ্রুতই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানান।