‘মন মানে না বাজান, তাই বারবার মাটির টানে এহানে ছুইটা আসি। এহানে এলে দুই-চারজন পরিচিত লোকজনের দ্যাহা মেলে। তাগো লগে কতা কইলে অন্তরডা জুড়ায় যায়। কিন্তু রাক্ষুসে পদ্মার দিকে তাকাইলে বুকের ভেতরডা হাহাকার করে ওঠে।’ পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে সর্বস্ব হারানো ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধ জিন্দার মোল্লা এভাবেই তার মনের কথাগুলো বলছিলেন।
সরেজমিন গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের পদ্মা নদীর ভাঙ্গনকবলিত মুন্সিবাজার এলাকায় কথা হয় জিন্দার মোল্লার সাথে। তিনি বলেন, দুই বছর আগে দেবগ্রাম ইউনিয়নের দেবগ্রাম গ্রামে আমার মতো কয়েক শ’ পরিবারের সাজানো সংসার ছিল। কিন্তু পদ্মা নদীর ভাঙনে আমরা সবাই সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি। আমি ছয় মাসের মতো স্থানীয় আরপিডিসের শূন্য ভিটায় কোনো মতে মাথা গুঁজে ছিলাম। এরপর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জটু মিস্ত্রি পাড়ায় মেজ ছেলের শ্বশুর একটু জায়গা দিলে সেখানে গিয়ে একটা ঘর তুলে কোনোমতে বসবাস করছি। বড় ছেলে চলে গেছে দক্ষিণ দৌলতদিয়া এলাকায়। ছোট ছেলেটা ঢাকায় কাজ করে। ও কোনো দিন বাড়িঘর করতে পারবে কি না জানি না।
জিন্দার মোল্লা দুঃখ করে বলেন, পদ্মা শুধু আমার বাড়িঘর ও ফসলি জমিই ভাঙেনি ভেঙেছে আমার মনটাও। ভাঙনে ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।
তাই মনটা যখন খুব ছটফট করে তখন কষ্ট হলেও এখানে ছুটে আসি। দু’চারজন পরিচিত লোকজনের সাথে দেখা হয়। একটু ভালো লাগে। তাছাড়া বড় ছেলেটা এখানে এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে পটোল ক্ষেত করেছে। এখানে এলে ক্ষেতটারও একটু দেখাশোনা হয়।
জিন্দার মোল্লা ক্ষোভের সাথে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার ভাঙনে দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া অঞ্চলে আমার মতো হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সরকার ভাঙন ঠেকাতে কোনোই ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এ সময় মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা নিকাত সরদার, রহিমা বেগম, সরিফা খাতুনসহ অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এবারের ভাঙনে এ এলাকায় তাদের যে কয়েকটি ঘর বাদ আছে হয়তো সেগুলোও ভেঙে যাবে।
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে পদ্মা নদীর ভাঙনে তার ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। চাপা কষ্ট নিয়ে যে যেখানে পেরেছে চলে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিকট আবেদন-নিবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি। তবে অনেক দিন ধরে শুনে আসছি দৌলতদিয়া ঘাট থেকে উজানে চার কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন রক্ষায় কাজ হবে। হলে ভালো কিন্তু যত দিনে হবে তত দিনে হয়তো আরো ক্ষতি হয়ে যাবে।