বারবার লকডাউন পরিস্থিতি সামাল দিতে এ পর্যন্ত দুগ্ধ ভাণ্ডার খ্যাত পাবনা-সিরাজগঞ্জের খামারিদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ খামারিরা রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ করছেন। তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দুধ কেনার দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে দেড় লক্ষাধিক গো-খামার রয়েছে। তা ছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গরু পালন হয়। এ অঞ্চলে প্রতিদিন ১৫ লাখ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। কঠোর লকডাউনে আফতাব, আকিজ, ইগলু, ফ্রেসমিল্ক, পিউরা মিল্ক, অ্যাংকার, প্রাণসহ ২০টি বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষ, ব্যবসায়ীরা দুধ ক্রয় বন্ধ রেখেছেন। খোলাবাজারে প্রতি লিটার দুধ ২৫-৩০ টাকা দরের বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত দুধ নিয়ে খামারিরা চরম বিপাকে পড়েছেন। দুগ্ধ শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাঘাবাড়ীর জাকির হোসেন জানান, এই দুগ্ধ শিল্পকে কেন্দ্র অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিয়ে গো-খামার গড়ে তুলেছিলেন। আবার অনেকে অন্য ব্যবসা ছেড়ে গো-খামারে বিনিয়োগ করেছিলেন। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে মহামারী রোধে দফায় দফায় দেয়া হয়েছে লকডাউন দেয়ায় উৎপাদিত দুধ বিক্রি করতে পারছে না। এতে অনেক খামারি পুঁজি হারিয়ে পথে পথে ঘুরছে। লোন পরিশোধের চিন্তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
পাবনার বেড়া পৌর এলাকার পুরস্কারপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা মাহফুজা খানম মিনা জানান, তার খামারে উৎপাদিত ৩০০ লিটার দুধ স্থানীয় ‘ঈগলুর সংগ্রহশালায়’ সরবরাহ করতেন। লকডাউনের আগেই তাকে জানিয়ে দেয়া হয় তারা আপাতত দুধ কিনবেন না। পরে দুধ নিয়ে গেলে তারা সেই দুধ ফিরিয়ে দেয়। খোলাবাজারে তিনি দুধ প্রতি লিটার ২৫ টাকা দামে বিক্রি করছেন। কম দামেও দুধের ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এক লিটার দুধ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৪৫-৫০ টাকা।
সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার সাঁথিয়া উপজেলার বোয়ালমারী প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বলেন, সমিতির ১৩২ জন সদস্য প্রতিদিন ৫০০ লিটার দুধ মিল্কভিটায় সরবরাহ করেন। বর্তমান অবস্থায় তারা ২২০ থেকে ২৫০ লিটার দুধ সরবরাহ করতে পারছেন। অবশিষ্ট দুধ খোলাবাজারে পানির দামে বিক্রি করে ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান পিউরার ব্যবস্থাপক আবদুর রউফ মানিক জানান, তিনি খামারিদের কাছ থেকে প্রতিদিন চার হাজার লিটার দুধ কিনে ঢাকায় সরবরাহ করে আসছিলেন। লকডাউনের শুরু থেকে দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। ঢাকা থেকে দুধের চাহিদাপত্র না পাঠানো পর্যন্ত তিনি দুধ কেনা বন্ধ রাখবেন বলে জানিয়েছেন।
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: আল মামুন হোসেন মণ্ডল বলেন, বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে বিপণন ব্যবস্থার অসুবিধার কারণ দেখিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান দুধ কেনা বন্ধ রেখেছে। এতে খামারিরা চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।