রঙ ও সুতার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানে লোকসানে জর্জরিত তাঁতশিল্পীরা। তাদের বাঁচাতে সে রকম কোনো উদ্যোগ না থাকায় একরকম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। ক্রমাগত লোকসানের ঘানি টানতে না পেরে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাঁত কারখানা। চরম অর্থ সঙ্কট ও সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় পুঁজির অভাবে খুব খারাপ দিন কাটছে তাঁতিদের। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে এক দশক আগেও দুই হাজার তাঁতকল সচল থাকলেও বর্তমানে সারা উপজেলা ঘুরে ৫০টি তাঁতকল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁতি পাড়ায় আর শোনা যাচ্ছে না তাঁতের খট খট শব্দ। পুঁজির অভাবে অনেক তাঁতশিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক ও মালিকরা তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
জানা গেছে, বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের পাটকিয়াবাড়ী, গঙ্গারামপুর, মধুপুর, খালিয়া, ছোট হিজলী, বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের পূর্ব মৌকুড়ী, ইসলামপুর ইউনিয়নের বারাদী, সারুটিয়াসহ বেশ কিছু গ্রামের তাঁতের তৈরি লুঙ্গি, শাড়ি, গামছার বেশ কদর ছিল। এখন বেশির ভাগ এলাকায় তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। বারাদী, পূর্ব মৌকুড়ি, সারুটিয়া এলাকায় আর কোনো তাঁত দেখা যায় না। তাঁত শ্রমিকরা ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সম্প্রতি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের গঙ্গারামপুর গ্রামের সড়ক দিয়ে যেতেই শোনা যায় দুই-একটি তাঁতের খট খট শব্দ। বাপ-দাদার আমলের পেশা ধরে রেখেছে এ গ্রামের কয়েকজন তাঁতি। গঙ্গারামপুর গ্রামের চাঁদ আলী মল্লিক বলেন, কাপড়ের দামের চেয়ে সুতার দাম বেশি হওয়ায় কাপড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে তেমন লাভ হয় না। এক থানে চার পিস লুঙ্গি হয়, এতে ব্যয় হয় ৫০০ টাকা আর বিক্রি হয় ৬৩০ টাকা। তাও কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে সুতা এনে কাপড় তৈরির পর আবার কুমারখালীতে নিয়েই বিক্রি করতে হয়। এতে শ্রমিকের বেতন, যাতায়াতসহ আনুষঙ্গিক খরচ পোশাতে পারি না। শুধু বাপ-দাদার ঐতিহ্য রক্ষায় শ্রমিক বাদ রেখে আমরা পরিবারের পাঁচ সদস্য শ্রম দেই।
তাঁতি আলাউদ্দিন মল্লিক বলেন, কাঁচামাল তুতে, সাগু, আতপ চাল, সোহাগা, রঙ, সুতাসহ উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেও কাপড়ের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ কারণে পাঁচটি তাঁত কারখানার মধ্যে একটি মাত্র সচল রেখেছি। অর্থাভাবে এটিও বন্ধ করে না দিতে হয় সেই চিন্তায় আছি।
সারুটিয়া গ্রামের শফিউল্লাহ মল্লিক বলেন, বাপ-দাদার তাঁতশিল্প এক সময় খুব জমজমাট ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে কোনো তদারকি ও সহজ শর্তে ঋণের কোনো সুযোগ না থাকায় অর্থাভাবে তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এখন মাঠে কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। শ্রমিকরা এখন কেউ ভ্যানচালক আবার অনেকে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। সরকারিভাবে নতুন করে উদ্যোগ নিলে আমরা আবার আদি পেশা তাঁতশিল্পে ফিরতে পারব।
গঙ্গারামপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মল্লিক বলেন, বালিয়াকান্দি উপজেলার তাঁতশিল্পের মধ্যে সবই প্রায় বিলুপ্তির পথে। তিনি বলেন, আমাদের গঙ্গারামপুর গ্রামে মাত্র ১০টি তাঁত শিল্প চালু রয়েছে। আমরা এখন এই শিল্প নিয়ে বিপাকে পড়েছি। বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। অর্থাভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বন্ধের পথে। তাই এ তাঁত শিল্প ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। অনেক তাঁতি এ শিল্প বাদ দিয়ে কৃষি ও অন্যান্য কাজে যোগ দিচ্ছে। সরকার যদি আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায় তাহলে হয়তো বাপ-দাদার গড়ে তোলা এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
পূর্ব মৌকুড়ী গ্রামের বাবর আলী মল্লিক বলেন, আমার বাবা আহেদ আলী মল্লিক ছিলেন সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য। তিনি ১৯৭২-৭৩ সালে সরকারিভাবে সুতাসহ অনুদান পান। তারপর আর কোনো সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি কেউ। ক্রমাগত লোকসানের কারণে আমার দু’টি তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। এখন পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি।
নারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, এ ইউনিয়নে অনেক তাঁতশিল্প ছিল। আজ তা বিলুপ্তির পথে। এখনো কেউ কেউ অনেক কষ্টে তাঁতশিল্পকে ধরে রেখেছেন। এদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আম্বিয়া সুলতানা বলেন, তাঁতিরা এখন অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ার কারণে তাঁতশিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছি। শিগগিরই বিষয়টি খতিয়ে দেখে তাঁতশিল্প রক্ষায় যা করা যায় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।