খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত একটি গ্রামের নাম চান্দপাড়া। উপজেলার ১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে দুর্গম এই গ্রামটির অবস্থান। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও এই গ্রামে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। গ্রামে রয়েছে যথেষ্ট সুপেয় পানির অভাব। স্থানীয়দের দাবি, বারবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে এই গ্রামে বসবাস করে আসছে মানুষ। হাতিরতাণ্ডবে ১৯৯০ সালে গ্রাম ছাড়েন তারা। ১৯৯৯ সালে এসে আবারো বসতি স্থাপন করেন। গ্রামে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৮৫টি। এই গ্রামে অন্তত ১ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ গ্রামে নেই বিদ্যুৎ এবং পানির সুবিধা। গ্রামে কয়েকটি পরিবার সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও বেশিরভাগ মানুষ বিদ্যুতের আলো থেকে বঞ্চিত। এক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে নলকূপ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের বেশিরভাগ ঘর বাঁশ, কাঠ এবং টিন দিয়ে তৈরি। পানির জন্য ঘরের আশপাশে নেই কোনো নলকূপ। কয়েকটি ঘরে সোলার প্যানেল থাকলেও নেই পানির কোনো উৎস।
৭০ বছর বয়সী সিরাজ মিয়া জানান, এই গ্রামে এখনো বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগেনি। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর। সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। অবস্থা সম্পন্ন কয়েকটি পরিবার সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বিদ্যুতের জন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ দৈনন্দিন জীবনে অনেক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে তাদের জীবনযাত্রার মান পাল্টে যাবে বলে জানান তিনি।
নলকূপ থেকে পানি নিতে আসা আমেনা বেগম (৩৫) জানান, দৈনন্দিন কাজগুলোর মাঝে পানি সংগ্রহ তার প্রধান কাজ। পানি না থাকলে ঘরের অন্য কাজগুলো করা যায় না। গ্রামে পানির কোনো উৎস নেই। প্রায় ১ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। দৈনিক ২ থেকে ৩ বার পানি সংগ্রহের জন্য আসতে হয় বলে জানান তিনি।
চান্দপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরি মোহাম্মদ নুরুদ্দিন জানান, এই গ্রামে সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া তেমন লাগেনি। পানি ও বিদ্যুতের অভাব মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে একাধিকবার আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমাদের দুর্ভোগ নিয়ে উদাসীন। নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিলেও জয়ী হওয়ার পরে তা ভুলে যান।
বাংলাদেশ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আবাসিক প্রকৌশলী আহসান উল্ল্যাহ জানান, কর্মস্থলে তিনি নতুন এসেছেন। তার সময়ে ভুক্তভোগী গ্রাম থেকে কোনো আবেদন আসেনি। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।
রামগড় ১ নম্বর ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ক্যারি মারমা জানান, এলাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। খুব দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পাবো বলে আশা করছি। আর পানির জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে একাধিকবার আবেদন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সুপেয় পানির ঘাটতি থাকায় মানুষ কষ্টকর জীবনযাপন করছে।
রামগড় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দীপ শিখা চাকমা জানান, এ ব্যাপারটি নিয়ে এলেও আমাদের কিছু করার নেই। প্রকল্পের জন্য উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দ আসতে হবে। তারা আমাদের সাইট নির্দিষ্ট করে দিলে আমরা কাজ করতে পারবো।
রামগড় ১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম মজুমদার বলেন, এই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের কথা তিনি জানেন। সমস্যাগুলো সমাধানে প্রকল্পের জন্য এডিপিতে আবেদন করেছেন। বরাদ্দ পেলে দ্রুত সমাধান হবে বলে জানান তিনি।
রামগড় উপেজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্ব ত্রিপুরা জানান, চান্দপাড়া গ্রামটি প্রত্যন্ত এলাকা বিধায় বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সুপেয় পানির সুবিধা দিতে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। ব্যক্তিগত অর্থায়নে কয়েকটি টিউবওয়েল দিয়েছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে খুব দ্রুত সমাধান করে দিবেন বলে আশ্বাস দেন।
তিনি আরো জানান, বিদ্যুৎ ছাড়া এই গ্রামের উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ বৈদ্যুতিক সুবিধা দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।



