ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ‍ঋণ দেয়ার প্রলোভনে গ্রাহকের বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছে ‘সিরাক বাংলাদেশ’ নামে একটি এনজিও। পৌরসভার সিটি কলেজ পাড়ায় এ ঘটনা ঘটেছে।

মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে হাজারের বেশি মানুষের প্রায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছেন এ বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা।

সিরাক বাংলাদেশ নামের সংস্থাটি ঋণ দেয়ার কথা বলে লাখে ১০ হাজার করে টাকা আদায় করে। ২৫ সেপ্টেম্বর অফিস খুলে ১ অক্টোবর ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়ে এই টাকা আদায় করেন এর কর্মকর্তারা। পরে ১ অক্টোবর অফিসে তালা লাগিয়ে সংস্থার সব কর্মকর্তা পালিয়ে যান।

গ্রাহকেরা জানান, তারা সরল মনে ঋণের আশায় এই টাকা দিয়েছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। তারা অফিসের সাইনবোর্ড আর সাজানো-গোছানো অফিস দেখে বিশ্বাস করে টাকা দেন। গ্রাহকেরা পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। এখন টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় প্রতিদিন তালাবদ্ধ অফিসের সামনে গিয়ে ভিড় করছেন তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শৈলকুপা শহরের কবিরপুর এলাকার সিটি কলেজ সড়কে একটি একতলা বাড়ির মূল ফটকের সামনে সাইনবোর্ড। তবে ফটকটি তালাবদ্ধ। সাইনবোর্ডটিতে লেখা রয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সিরাক বাংলাদেশ, ক্ষুদ্র ঋণদান ও কুটির শিল্প প্রকল্প।’

অফিসটির সামনে দেখা গেল অনেক মানুষের ভিড়। তারা ঋণ পাওয়ার আশায় টাকা দিয়ে এখন প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন বলে জানান।

কথা হয় দিগনগর গ্রামের রুহুল আমিনের সাথে। তিনি জানান, স্ত্রী লাভলী খাতুনের নামে বই খুলে দুই লাখ টাকা ঋণ নিতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর তার বাড়ি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেন সংস্থাটির কর্মকর্তা নাজমুল হাসান।

সাতগাছি গ্রামের ফিরোজ হোসেন জানান, স্ত্রী সীমা খাতুনের নামে বই করে জমা দিয়েছেন ৫ হাজার টাকা। তিনি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিতে চেয়েছিলেন। নাদপাড়া গ্রামের বজলুর রহমান জানান, তিনি স্ত্রী চকেলা খাতুনের নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিতে ৫ হাজার জমা দিয়েছেন। ২৯ সেপ্টেম্বর তার টাকা নেয় সংস্থাটি। সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন দুই লাখ টাকা ঋণের আশায়। তিনি বিকাশের মাধ্যমে এই টাকা দিয়েছেন।

সিরাক বাংলাদেশ অফিসের পাশের বাড়ির বাসিন্দা মহিউদ্দিন জানান, সংস্থাটি যে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিল, সেই বাড়ির মালিক আকবার আলী থাকেন গ্রিসে। তার স্ত্রী সীমা খাতুন ঝিনাইদহে বসবাস করেন। সীমা খাতুনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে বাসাটি ভাড়া নিতে চান সিরাক বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। তারা বাসা দেখার কথা বলে সেখানে কিছু চেয়ার-টেবিল নিয়ে আসেন ও পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে অগ্রিম দিয়ে চুক্তিপত্র তৈরি করবেন বলে জানান। এরই মধ্যেই হুট করে বাড়ির ফটকে সংস্থার সাইনবোর্ড ঝোলান তারা।

মহিউদ্দিন আরো জানান, ১ অক্টোবর থেকে বাসা ভাড়া নেয়া হবে না বলে তার কাছে চাবি রেখে চলে যান সংস্থার কর্মকর্তারা। পরে তিনি তালা খুলে দেখেন, ভেতরে কয়েকটি চেয়ার-টেবিল। তিনি নিজেও মেয়ে মিতা খাতুনের নামে বই খুলে ১৫ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেয়ার কথা ছিল তার।

স্থানীয় সাইফুল ইসলাম জানান, সংস্থাটির কর্মকর্তারা খুব বেশি পরিচিতি পাননি। মাত্র পাঁচ দিন এখানে থাকলেও বেশির ভাগ সময় তারা অফিসের মধ্যেই থেকেছেন। বাইরে অর্থ সংগ্রহের জন্য বেরিয়েছেন। তবে সংস্থার প্রধান বলে পরিচয় দেন নামজুল হোসেন।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন দলে দলে গ্রাহক আসছেন। তারা ক্ষোভের কথা বলছেন। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, কর্মকর্তারা সহস্রাধিক মানুষের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এখন তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো বন্ধ রয়েছে।

বাড়ির মালিকের স্ত্রী সীমা খাতুন জানান, তারা ফোনে কথা বলেছেন মাত্র। এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। তিনি অসুস্থ ছিলেন। এই সময়ে চাবি নিয়ে খুলে সেখানে চেয়ার-টেবিল উঠিয়েছেন, এটা তিনি জানতেন না।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক শেখ আবদুল লতিফ জানান, সিরাক নামে কোনো সংস্থা তাদের দফতরের নিবন্ধিত নয়। শৈলকুপা শহরে অফিস করার বিষয়টিও তাদের জানা নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

শৈলকুপা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ আহম্মেদ জানান, শৈলকুপাতে সিরাক বাংলাদেশ নামের কোনো এনজিও ঋণ কার্যক্রমের জন্য নিবন্ধিত নয়।

বিষয়টি নিয়ে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কেউ এমন অভিযোগ নিয়ে আসেনি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখবো।