সারাদেশে ৬ষ্ঠ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার দিনই দাফন করা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা চেয়ার‌ম্যান ও নান্দুরা গ্রামের ডা. আবুল কাশেমের ছেলে এরশাদুল হককে। নাটঘর ইউনিয়নে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচনে পুনরায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

শনিবার রাতে এশার নামাজের পর জানাজা শেষে এরশাদুল হককে নান্দুরা কবরস্তানে দাফন করা হয়।

অপরদিকে শনিবার সন্ধ্যায় সারাদেশের ইউপি নির্বাচনের ৬ষ্ঠ ধাপের তফসিল ঘোষণা করা হয়। আগামী ৩১ জানুয়ারি ৬ষ্ঠ ধাপে ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হবে নাটঘরসহ নবীনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে।

এর আগে গত শুক্রবার রাতে ইউনিয়নের কুড়িঘর বাজারে আয়োজিত এক ওয়াজ মাহফিল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পূর্ব বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ হারান এরশাদুল হক ও তার মোটরসাইকেল চালক বাদল সরকার।

শনিবার স্থানীয় শশ্মানেই বাদল সরকারকে দাহ করা হয়।

জোড়া খুনের ঘটনায় শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে নিহত এরশাদুল হকের ভাই আক্তারুজ্জামান বাদী হয়ে নান্দুরা গ্রামের আবু নাসেরের ছেলে নজরুল ইসলামকে প্রধান আসামী করে এজাহারনামীয় ১৬ জন ও অজ্ঞাত আরো চারজনের বিরুদ্ধে নবীনগর থানায় মামলা করেছেন।

এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের জেরে কুড়িঘর ও নান্দুরা গ্রামে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কুড়িঘর বাজারের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। বিক্ষুব্ধ লোকজন কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, এরশাদ ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এই জনপ্রিয়তাই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়ে। শুক্রবার রাতে স্থানীয় কুড়িঘর বাজারের পাশে ওয়াজ মাহফিল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে পুর্ববিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকেরা এরশাদকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান মোটরসাইকেল চালক বাদল সরকার। গুরুতর আহত এরশাদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনিও মারা যান।

নিহত বাদল সরকার নাটঘর ইউনিয়নের নান্দুরা গ্রামের সন্তোষ সরকারের ছেলে।

নিহতের ছোট ভাই আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ওয়াজ মাহফিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমি ভাইয়ের সামান্য পেছনে ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে সামনে গিয়ে দেখি এরশাদ ভাই রাস্তার পাশে পরে রয়েছেন, হামলাকারীরা প্রায় ১৫/১৬জন ছিলো, গুলি করতে করতে ওরা মোটরসাইকেল দিয়ে পালিয়ে যায়। আমি তাদের ধরতে চেষ্টা করলে তারা আমার উপরও গুলি চালায়। হামলাকারীদের অনেককেই চিনতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাই এলাকার মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। এলাকাবাসীর চাপে তিনি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন । ২০১৯ সালে উপজেলা নির্বাচনের পরের দিন আমার চাচাতো ভাই সাইদুলকে কুড়িঘর বাজারে খুন করা হয়। ওই খুনের মামলার বাদী ছিলো এরশাদ ভাই, গত কয়েক দিন আগে ওই মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য আসামী পক্ষ থেকে ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব আসলে মামলা আইনের গতিতে চলবে জানিয়ে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা হয়। আমার ভাইয়ের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষনা এবং মামলা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কারনেই আসামী পক্ষের লোকজন গুলি করে আমার ভাইকে ও বাদল সরকারকে হত্যা করেছে।’

নিহতের বাবা ডা.আবুল কাশেম চেয়ারম্যান বলেন, ’আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেশ কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছে। আমার ছেলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলো, ২০১৯ সালে আমার এক ভাতিজা খুন হয়। সেই খুনের সঙ্গেও এর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে আমি মনে করছি। আমার ছেলের খুনের ঘটনার ন্যায্য বিচার প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবী করছি, আমি খুনিদের ফাঁসি চাই। ‘

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খান বলেন, ’গ্রেফতার এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে, বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক তদন্ত শেষে বলা যাবে কি কারনে এই ঘটনা ঘটেছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বসহ বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি,যত দ্রুত সম্ভব রহস্য উদঘাটন করার লক্ষে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি জানান, এই ঘটনার মামলায় আসামী সোহাগ মিয়া নামের এক যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। অন্যদের গ্রেফতারেও পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।