প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদ ও জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। তার লেখায় ফুটে উঠেছিল বিদ্রোহী আত্মার প্রতিচ্ছবি। তাই তিনি বিশ্ব দরবারে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা বিখ্যাত সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বৃহস্পতিবার ৬ জানুয়ারি তৎকালীন বিজলী পত্রিকায় প্রকাশের শতবর্ষ পেরোলে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কবির স্মৃতি বিজরিত কার্পাসডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত হয় এক ভিন্ন আয়োজন। কার্পাসডাঙ্গা নজরুল স্মৃতি সংসদের আয়োজনে এদিন দুপুরে শতবর্ষে শতকণ্ঠে পাঠ করা হয় বিদ্রোহী কবিতা- বলো বীর, বলো উন্নত মম শির...।
এই কবিতা পাঠে অংশ নেন কার্পাসডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ সাংবাদিক-রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা পর্যায়ের ১০০ জন মানুষ। একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র লতিফুর রহমানের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বিদ্রোহী কবিতার পঙক্তিগুলো।
এর আগে বেলা ১১টায় নজরুল স্মৃতি সংসদের সভাপতি এম এ গফুরের সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিনিয়র সাংবাদিক ও গীতিকার শাহ আলম সনি, সিনিয়র সাংবাদিক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম এবং আয়োজনের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম, দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সাবেক ডিজিএম খালেকুজ্জামান, কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আপেল উদ্দীন, আতিয়ার রহমান, ক্রিস্টোফার মিথুন ও রঘুনাথ পাল কবির জীবন-কর্ম ও বিদ্রোহী কবিতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। শতকণ্ঠে কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নজরুল স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক সাইফুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬-২৭ সালে একাধিকবার এসেছেন চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায়। এখানে তিনি আসতেন কার্পাসডাঙ্গার শিক্ষানুরাগী বাবু মহিম সরকারের আমন্ত্রণে। থাকতেন তৎকালীন নদীয়া কংগ্রেসের সম্পাদক প্রয়াত হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের আটচালা ঘরে। যেন ঘরটি আজও কবির স্মৃতি বহন করছে। এখানে একবার তিনি একটানা দুমাস অবস্থান করেছিলেন।
বর্তমানে কাপার্সডাঙ্গায় অবস্থিত কবির স্মৃতিবিজড়িত ওই আটচালা খড়ের ঘরে বসবাসকারী কবির দীর্ঘ দিনের বন্ধু হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বংশধরদের তথ্যানুয়াযী, কার্পাসডাঙ্গার ধনাঢ্য ও শিক্ষানুরাগী বাবু মহিম সরকার থাকতেন কলকাতার আমহাস্ট স্ট্রিটে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাবু মহিম সরকারের দুই মেয়ে আভারানী ও শিউলি রানীকে গান শেখাতেন। সেই সূত্র ধরে এবং তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন চলাকালে কবি সপরিবারে বাবু মহিম সরকারের আমন্ত্রণে কার্পাসডাঙ্গায় আসেন। সে সময় নদীয়া জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাড়ির আটচালা ঘরে প্রায় দুইমাস ছিলেন তিনি। কবি এখানে অবস্থানকালে ব্যথার দান, মৃত্যুক্ষুধা, উপন্যাস লিখেছেন।
কার্পাসডাঙ্গার যে বাড়িতে তিনি থাকতেন তার পাশেই ছিল এক লিচু বাগান। কবির বিখ্যাত কিশোর কবিতা লিচুচোর এই বাগানে বসেই লেখা। প্রায়শই কবি এই লিচু বাগানে বসতেন। স্থানীয় নজরুল ভক্তদের উদ্যোগে প্রতিবছর কবির জন্মদিন ও মৃত্যুদিন চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায় নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে পালন করা হয়। এবার কবির বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের শতবর্ষে করা হলো এই ভিন্ন আয়োজন।



