বংশমর্যাদা রক্ষায় প্রেমিক পরিবারের পক্ষে শালিসীতে প্রেমিকাকে অস্বীকার করায় রাগে, দুঃখে ক্ষোভে ও লোকলজ্জায় প্রেমিকা প্রিয়া দাস (১৬) নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) রাতে খুলনার পাইকগাছা পৌর এলাকায়। সে পাইকগাছা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বাবুলাল দাসের মেয়ে।
থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরোতহাল রিপোর্ট শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করেছে।
স্থানীয়রা জানান, সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি গ্রামের সুবির দাশের ছেলে রাজু দাশ’র সাথে প্রিয়ার দীর্ঘ দিন যাবত প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। সর্বশেষ তাদের সম্পর্কটি গভীর পর্যায়ে পৌঁছালে প্রিয়া তাকে বিয়ের দাবিতে একাধিকবার কৃষ্ণকাটিস্থ রাজুর বাড়িতে গিয়ে ওঠে। তাৎক্ষণিক রাজুর পরিবার বিষয়টি সামাল দিতে রাজু বাড়িতে নেই জানিয়ে কিশোরী প্রেমিকা প্রিয়াকে পরে রাজুর সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
এরপর কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) বিকেলে পুনরায় ওই তরুণী বিয়ের দাবিতে প্রেমিক রাজুদের বাড়িতে গেলে সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে জেঠুয়া এলাকার এক রাজনৈতিক নেতার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে শালিসী বসে। সেখানে ভুক্তভোগী প্রিয়া দাস, তার বাবা, প্রতিবেশী এক কাকা, পিসি ও রাজুর বাবা সুবির দাশসহ স্থানীয়দের উপস্থিতিতে শলিসীতে প্রিয়ার অমতে প্রেমিক রাজুর সাথে বিয়ে না হওয়ার শর্তে বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর বাড়িতে ফিরে প্রিয়া ওই রাতেই নিজ ঘরের আঁড়ায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
এদিকে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে কতিপয় প্রভাবশালী মহল ইতোমধ্যে বিভিন্নস্থানে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেছে। প্রিয়ার পরিবারকে ম্যানেজ করতেও লবিং শুরু করেছে বলে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সরেজমিনে শুক্রবার (১ এপ্রিল) দুপুরে কৃষ্ণকাটিস্থ রাজুর বাড়িতে গেলে তাদের কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের বসত ঘরটিও তালাবদ্ধ দেখা যায়। এ সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়দের অনেকেই এ প্রতিনিধিকে জানান, রাজুরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা সাংবাদিকের সাথে তাদের ব্যাপারে কথা বলেছেন- এটা জানতে পারলেও তাদেরকে মারধর করবে। বিভিন্ন সময় প্রতিবেশীরাও তাদের ভয়ে সার্বক্ষণিক তটস্থ থাকেন।
তারা আরো জানান, প্রিয়া দাস নামে পাইকগাছার একটি মেয়ে প্রায় মাস খানেক আগে রাজুর সাথে প্রেমের সম্পর্কের এক পর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে অন্তঃসত্ত্বা জানিয়ে বিয়ের দাবিতে রাজুদের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিল। এমনকি সে ওই বাড়িতে রাত্রিযাপন করে বলেও জানায়। এর পর রাজুর বাবা সুবির দাশ স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে তার ছেলে বাড়িতে নেই এমনকি বাড়িতে ফিরলে তার সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রিয়ার জনৈকা মাসির সাথে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।
স্থানীয়রা আরো জানান, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে তালা উপজেলার জেঠুয়া এলাকার এক রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীর অফিসে শালিসী বসে। সেখানে প্রিয়ার অমতে স্বাক্ষর নেয়া হয়। এরপর বাড়ি ফিরেই অপমান ও লোকলজ্জায় নিজ ঘরের আঁড়ায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে সে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু জানান, তিনি বিষয়টি লোকমুখে শুনেছেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানেন না। তবে ওই ঘটনার মিমাংসায় জেঠুয়া এলাকায় বসাবসি হয়েছে বলে লোকমুখে শুনেছেন তিনি। এর মাস খানেক আগে পাইকগাছার এক তরুণী অন্তঃসত্ত্বা দাবি করে রাজুর বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ওই সময় ভুক্তভোগী তরুণী রাজুদের বাড়িতে রাত্রিযাপনও করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার শালিসীর ব্যাপারে তাকে কোনো পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। ঘটনার তদন্তপূর্বক বিচার দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইন্দ্রজীৎ দাশ বাপী শালিসীর বিষটি স্বীকার করে বলেন, তিনি বৃহস্পতিবারই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন। এর আগের কোনো ঘটনা তার জানা নেই। আর রাজুর বাবা বিষয়টি মিমাংসার জন্য মেয়ে পক্ষকে নিয়ে তার অফিসে গিয়েছিল। তবে প্রিয়ার কাছ থেকে কোনো প্রকার লিখিত নেয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
টাকা-পয়সা লেনদেনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, মেয়েটির ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাকে অন্যত্র বিয়ের খরচ বহন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তবে তাদেরকে টাকা নিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়নি বরং শালিশীর সিদ্ধান্ত তাদের পছন্দ না হলে তাদেরকে আইনের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউর রহমান জানান, প্রেমঘটিত কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে।



