আবাসিক হোটেল থেকে ডেকে নিয়ে এক কলেজছাত্রকে অমানবিক নির্যাতন করেছেন তারই কলেজের এক শিক্ষক। বেদম মারপিটে জখম হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন ওই শিক্ষার্থী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যথার্থ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেনি বলে অভিযোগ।
রোববার সকালে ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরবঙ্গ তথা দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৈয়দপুর সরকারী বিজ্ঞান কলেজে (সাবেক কারিগরি মহাবিদ্যালয়)। এ ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যায়ভাবে শিক্ষকের প্রহারের শিকার কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মামুনুর রশিদ মামুন আবাসিক হোস্টেলের ৩০৯ নম্বর কক্ষে নিজ বিছানায় শুয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আমার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শোভাগঞ্জে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে এই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছি। কোনোদিন কোনো শিক্ষক বলতে পারেননি যে, কারো সাথে সামান্যতম বেয়াদবি করেছি। অথচ আমাকেই মিথ্যে অভিযোগে অমানবিক নির্যাতন করলেন সোহেল আরমান স্যার।
ঘটনার বিবরণে তিনি বলেন, রোববার ক্লাসে যাইনি। এ অবস্থায় সকাল ১০টার দিকে তাকে পিয়ন দিয়ে টিচার্স রুমে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে উপস্থিত হলে বাংলার প্রভাষক সোহেল আরমান কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন তার নামে কেন ফেক ফেসবুক আইডি খুলেছি?
এমন প্রশ্নে আমি হতবাক হয়ে যাই। কেননা এ ব্যাপারে আমার কিছুই জানা নেই। তাছাড়া এ ধরনের কিছু আমি বা আমরা করিনি। তারপরও স্যার অকস্মাৎ আমার দুই গালে সজোরে থাপ্পড় মারেন। এতে আমি হতচকিত হয়ে পড়ি।
উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা নিষেধ করা সত্বেও সোহেল স্যার একটা গাছের ডালের তৈরি মোটা লাঠি দিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে থাকেন। এতে আমার ডান হাত, কোমড়, পিট ও পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পাই এবং মেঝেতে লুটে পড়ি। তবুও তিনি আঘাত করতে থাকেন।
এ সময় রসায়ন প্রভাষক জাকিরুল ইসলাম স্যার ও একই বিষয়ের প্রদায়ক (ডেমনস্ট্রেটর) আব্দুল আজিজ স্যার আমাকে উদ্ধার করেন। অন্য স্যাররা নিষেধ করলেও তিনি আরো মারার জন্য উদ্যত হন।
শিক্ষার্থী মামুন বলেন, সোহেল আরমান স্যার যে অভিযোগ করছেন, সে ঘটনার সাথে আমার সম্পৃক্ততা না পেয়েও অহেতুক নির্যাতন করেছেন। এমনকি আমাদের কয়েকজন সহপাঠীর ব্যক্তিগত ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ঢুকে অনধিকার চর্চা করেছেন।
সেখানেও আপত্তিকর কিছু পাননি। তবুও তিনি আক্রোশমূলকভাবে এই কাজ করেছেন। অথচ গ্রুপের আর কাউকেই তিনি এমন করেননি। এতে মনে হয় তিনি আগে থেকেই আমাকে মারার জন্য অজুহাত খুঁজছিলেন। তাই সামান্য ছুঁতোয় সেই সুযোগ নিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আঘাতের কারণে আমি হাত নাড়াচাড়া করতে পারছি না। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। এক্সরে করা হলেও আমি সন্তুষ্ট নই। কারণ মনে হচ্ছে আমার হাতের হাড় ফেটে বা ভেঙে গেছে। আমি ভাল চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে যেতে চেয়েছি। কিন্তু স্যাররা যেতে দেননি।
আবাসিক হোস্টেলের সিংহভাগ শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন যে, নির্যাতনকারী ওই শিক্ষক নানাভাবে তাদের হেনস্থা করেন। ক্লাসে অশ্রাব্য কটু কথা বলে হেয় করেন। এমনকি মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাথেও অসদাচরণ করেন। তার টর্চারে কলেজের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী অতিষ্ঠ।
তারা বলেছেন, এর আগেও এমন ছাত্র পেটানোর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার বিহিত দাবি করেন তারা। নয়তো সামনে আরো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে পারেন আশঙ্কায় তারা নাম প্রকাশে অসম্মতি জানান।
প্রভাষক সোহেল আরমান বলেন, কয়েকদিন হলো কে বা কারা আমার নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। সেখানে আপত্তিকর পোস্ট দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে আমি বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি কলেজের শিক্ষার্থীরাই এই কাজ করেছে। এমতাবস্থায় সহকর্মী অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি মাত্র।
তাদের সাথে কথা বলে ধারণা হয়েছে মামুনই এদের নাটের গুরু। তাই তাকে শাসন স্বরূপ দুটি চপেটাঘাত করেছি। আর লাঠিটা দিয়ে ভয় দেখাতে গিয়ে তার হাতে লেগেছে। এতে আমি অনুতপ্ত। সাথে সাথেই তাকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা দিয়েছি। অথচ সামান্য এই ঘটনাকে নিয়ে সে সবাইকে দিয়ে আমাকে হয়রানি করছে।
আপনি কি শতভাগ নিশ্চিত মামুন আপনার নামে ফেক আইডি খোলার জন্য দায়ী? এমন প্রশ্নে ওই শিক্ষক বলেন- না। তবে ওদের একটা পার্সোনাল গ্রুপ আছে। সেখানে আমাকে নিয়ে মামুন বিরূপ মন্তব্য করেছে যা শোভনীয় নয়। তাই তাকে সতর্ক করার জন্যই শাসন করেছি। কিন্তু অসাবধানতা বশতঃ তা হিতে বিপরীত হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ গোলাম ফারুক প্রশিক্ষণের জন্য বাইরে থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মূলতঃ বাচ্চাদের ভালোর জন্যই ফেক আইডি খোলার ব্যাপারে জড়িতদের একটু শাসাতেই সকল শিক্ষকের উপস্থিতিতেই জিজ্ঞাসা করা হলে মামুনের নাম আসায় তাকে তিনি থাপ্পড় মেরেছেন। তাছাড়া আর কিছু না। এ নিয়ে এতটা প্রতিক্রিয়া দেখানোর কী আছে? অধিকার থেকেই অভিভাবক হিসেবে এটুকু করা হয়েছে।’
এদিকে ঘটনাটি মামুন তার বাবাকে জানালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ হয়ে রংপুরের সংবাদকর্মীর মাধ্যমে সৈয়দপুরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্বনামধন্য ওই প্রতিষ্ঠানের এহেন নেতিবাচক ঘটনা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কথা উঠেছে, ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানে ইতোপূর্বে এমন ঘটনা ঘটেনি।
সোহেল আরমান স্যারের এই অপরিণামদর্শী ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে সেই সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কারণ ইতোপূর্বেও তিনি এমন ন্যাক্কারজনক কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই সচেতনমহল বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



