ময়মনসিংহের ভালুকা ও উথুরা রেঞ্জের আওতায় শতাধিক অবৈধ করাতকল গিলে খাচ্ছে জাতীয় উদ্যান ও হবিরবাড়ির ঐতিহ্যবাহী ১১ গড়সহ সংরক্ষিত বনের গাছ। উদ্যানের প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে উপজেলার বাটাজোর বাজারে ৮-১০টিসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকলে অবাধে চেরাই হচ্ছে বিশাল বিশাল শাল-গজারি ও আকাশমনি গাছ। সঙ্ঘবদ্ধ গাছ পাচারকারীরা স্থানীয় বনবিভাগকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে অব্যাহতভাবে সরকারি বনের গাছ কেটে নিয়ে দিনদুপুরে এসব করাতকলে চেরাই করা হচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভালুকার কাচিনা ইউনিয়নের কাচিনা, বাটাজোর বাজার, মল্লিকবাড়ি, মাস্টারবাড়ি, কাশরগড়, মহাসড়ক সংলগ্ন মল্লিকবাড়ি মোড় ও মল্লিকবাড়ি বাজার, উথুরা রেঞ্জ অফিস সংলগ্ন উথুরা বাজার, চামিয়াদী বাজার, কৈয়াদী বাজার, ভরাডোবা বাসস্ট্যান্ড এলাকা, আঙ্গারগাড়া, ডাকাতিয়া চৌরাস্তা বাজার, পনাশাইল বাজার, বিরুনীয়া বাজার ও চান্দাব বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা শতাধিক লাইসেন্সবিহীন করাতকলে দিনরাত চলে শাল-গজারি ও আকাশমনি কাঠ চেরাই। বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবাধে এসব গাছ কাটা হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এমনকি অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ তো দূরের কথা, সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বনবিভাগকে ম্যানেজ করে নতুন নতুন করাতকল গড়ে উঠছে।
জানা গেছে, বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা উন্নয়নের জন্য সরকার বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন ১৯৭৪-এর ২৩ (৩) ধারার আওতায় ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর এক আদেশবলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাচিনা ইউনিয়নের পালগাঁও এলাকায় ৮৫০ একর ভূমির সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এখানে রয়েছে পুরনো শাল-গজারি গাছের অপরূপ সবুজের সমারোহ। জাতীয় উদ্যান হিসেবে ওই এলাকাটি চিহ্নিত হওয়ার পর তা সংরক্ষণে সরকারিভাবে কাজ শুরু হয়। কিন্তু জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে একটি চক্র উদ্যানের গাছ কাটা শুরু করে। চক্রটি রাতে উদ্যান এলাকা থেকে গজারি গাছ কেটে ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে পাশের বাটাজোর বাজার ও আশপাশের বিভিন্ন করাতকল মালিকদের কাছে পৌঁছে দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাদিগড় মৌজার ৩৮৩ নম্বর দাগে তালাব দক্ষিণপাড়া মরাপুড়া ব্রিজের উত্তর ও পশ্চিমে বেশ কয়েকটি চালা থেকে বিশাল বিশাল গজারি গাছ কেটে চুরি করে নিচ্ছে একটি চক্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় বেশ কয়েকজন এসব চালা থেকে গজারি গাছ কেটে নিয়ে বন উজাড় করছে এবং এসব ফাঁকা জমি দখল করে বাঁশঝাড়সহ বিভিন্ন ফসলের বাগান করছে।
বন আইনে বন এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও কাদিগড় বনাঞ্চল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে কাচিনা বাজার ও আড়াই কিলোমিটার দূরে বাটাজোর বাজার এলাকায় ২০টি লাইসেন্সবিহীন করাতকল গড়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক করাতকল মালিক জানান, বনবিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এমনকি প্রতি মাসে প্রতিটি করাতকল পরিচালনার জন্য দুই হাজার টাকা সেলামি দিয়ে লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর উদ্যোনের গাছ কেটে চেরাই করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এলাকার প্রতিটি স মিল মালিকের নিজস্ব ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। তাই এসব চোরাই কাঠ সহজেই আশপাশ এলাকায় বিক্রিসহ তাদের ফার্নিচারের দোকানে ব্যবহার করতে পারেন।
উপজেলার বাটাজোর বাজারে অবস্থিত অবৈধ দু’টি করাতকলের মালিক নয়ন মিয়া জানান, তারা প্রতি মাসে সব মিল থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা কালেকশন করে স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তাকে মাসোহারা দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
এ ব্যাপারে কাদিগড় বিট কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন মাসোহারা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, প্রতিটি করাতকল মালিককে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে সতর্কতামূলক চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে অবৈধ করাতকল সরিয়ে না নিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
হবিরবাড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা রইস উদ্দিন জানান, জাতীয় উদ্যানের আশপাশসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা করাতকল মালিকদের বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল জানান, ভালুকায় এক দিকে ইটিভি বন্ধ রেখে মিল কারখানাগুলো অব্যাহতভাবে বর্জ্য ফেলে পরিবেশের ক্ষতি করছে আর অন্য দিকে অবৈধ শতাধিক করাতকল জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে সাবাড় করে চলেছে। তিনি আরো বলেন, গত ১ জানুয়ারি স্থানীয় বন অফিসের নতুন ভবন উদ্বোধনকালে বনমন্ত্রী পরিবেশ ও বনাঞ্চল রক্ষার্থে অবৈধ করাতকল উচ্ছেদের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেলেও বনবিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন বলেন, বনের গাছ কাটা রোধে এরই মধ্যে করাতকল মালিকদের চিঠি দেয়ার জন্য বনবিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ভালুকায় শতাধিক করাতকলে সংরক্ষিত বনের গাছ উজাড়
ময়মনসিংহের ভালুকা ও উথুরা রেঞ্জের আওতায় শতাধিক অবৈধ করাতকল গিলে খাচ্ছে জাতীয় উদ্যান ও হবিরবাড়ির ঐতিহ্যবাহী ১১ গড়সহ সংরক্ষিত বনের গাছ। উদ্যানের প্রায় এক কিলোমিটারের...



