শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়হীনতা, অ-পূর্ণাঙ্গ ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে বিএনপির অন্যতম অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের কার্যক্রম। দলীয় কর্মসূচিতেও থাকছে নামকাওয়াস্তে অংশগ্রহণ। এমতাবস্থায় দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ২৯ জানুয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ‘জাতীয়তাবাদী জেলে দল’ নামে একটি অঙ্গসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯৯৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির চতুর্থ জাতীয় কাউন্সিলে ওই সংগঠনের নাম বদলে রাখা হয় ‘জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল’। সংগঠনের গঠনতন্ত্র মতে- সবুজ বিপ্লবের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল কাটা কর্মসূচি শুরু করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল- খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামের মজা-পুকুর সংস্কার এবং খালে মাছ উৎপাদন করা। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিজ ও আমিষের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ ছাড়াও মৎস্যজাত দ্রব্য রফতানির মাধ্যমে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও মৎস্যজীবীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সু-সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। এমনকি ১৯৯৩ সালের ১ আগস্ট ‘মৎস্য পক্ষ’ ও ‘মৎস্যমেলা’ উদ্বোধনকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মৎস্য সম্পদকে ‘মৎস্যশিল্প’ হিসেবে ঘোষণা দেন। এ ছাড়া সংগঠনের মাধ্যমে মৎস্য চাষ কার্যক্রম গ্রহণ করে মাছ চাষকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার কথা গঠনতন্ত্রে বলা আছে।
জানা যায়, ২০০০ সালে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে সভাপতি ও নজরুল ইসলামকে সেক্রেটারি করে মৎস্যজীবী দলের একটি কমিটি হয়। ওই কমিটি সফল না হওয়ায় পরে তা বাতিল করে ২০১১ সালের ২ ডিসেম্বর আবারো মাহতাবকে সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক নেতা মিলন মেহেদীকে সেক্রেটারি ও ঢাকা কলেজের সাবেক জিএস মরহুম আবদুল আউয়াল খানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে মৎস্যজীবী দলের তিন সদস্যের নতুন কমিটি দেয়া হয়। একপর্যায়ে সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহতাবের সাথে মিলন মেহেদী ও আবদুল আউয়াল খানের তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। দেয়া হয় পাল্টাপাল্টি কমিটি। ফলে সংগঠনের কার্যক্রম মুখথুবড়ে পড়ে। ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ২৩ জন যুগ্ম আহ্বায়কসহ ১২৯ সদস্য নিয়ে ১৫৪ সদস্যবিশিষ্ট মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাব ফের আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০-এর দশকের মেধাবী ছাত্রদল নেতা মো: আবদুর রহিম সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান। রফিকুল ইসলাম মাহতাব বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
সংগঠনের তৃণমূলের অভিযোগ- বর্তমান কমিটির কয়েকজন নেতা একই পরিবারের সদস্য। অথচ তাদের অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য নন। আহ্বায়ক ইচ্ছামতো কাজ ও পছন্দের লোক দিয়ে বিশেষভাবে নিজের আত্মীয়স্বজন দিয়ে কমিটি গঠনের চেষ্টা করেন। সাধারণ সম্পাদকও পছন্দের লোকদের সমন্বয়ে কমিটির দেয়ার চেষ্টা করেন। ফলে সংগঠনে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। যদিও সংগঠনের একটি বিশাল অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সদস্যসচিব মো: আবদুর রহিম। তার সততা ও দক্ষ নেতৃত্বে মৎস্যজীবী দল সারা দেশে অনেকটা শক্তিশালী হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মাহতাব বলেন, কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে তবে পূর্ণাঙ্গ করতে পারিনি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাউন্সিল করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠনেরই একটা অংশ সম্মেলনের জন্য বাঁধা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মিথ্যা। যারা সক্রিয় ছিল তাদেরই পদ দেয়া হয়েছে। দুই পদে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকেই তো একাধিক পদে আছে। দল আমাকে যেখানে রাখবে সেখানেই থাকব। একক স্বাক্ষরে কমিটি দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সদস্যসচিব কমিটিতে স্বাক্ষর না করায় আমিই স্বাক্ষর করে তার কাছে পাঠাই। কিন্তু তিনি স্বাক্ষরও করেননি, মতামতও দেননি।
জানা গেছে, মৎস্যজীবী দলের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে শিগগিরই নতুন কমিটি দেয়া হবে। সম্ভাব্য কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় আছেন বিএনপির মৎস্যবিষয়ক সম্পাদক লুৎফর রহমান কাজল ও মৎস্যজীবী দলের সদস্যসচিব মো: আবদুর রহিম। বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মাহতাবসহ আরো কয়েকজন থাকতে চান। মৎস্যজীবী দলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি পদে আলোচনায় আছেন- যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিম চৌধুরী, অধ্যক্ষ সেলিম মিয়া, জাকির হোসেন খান, ওমর ফারুক পাটোয়ারি। এ ছাড়াও দলের নেতা এম এ হান্নান মল্লিক, জহিরুল ইসলাম বাশার, কামাল উদ্দিন চৌধুরী টিটো, তরিকুল ইসলাম মধু, লোকমান হোসেন হাওলাদারও শীর্ষ পদে থাকতে চান। এদের মধ্যে তরিকুল ইসলাম মধু, বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মাহতাবের চাচাতো ভাই এবং লোকমান হোসেন হাওলাদার তার আপন শ্যালক। তা ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল হক হাবিব, ফরিদ আহমেদ মানিক, কবির উদ্দিন মাস্টার, জাহাঙ্গীর আলম সনি, কামাল উদ্দিন বাধন মিয়া, মাহবুব আলম সিকদার, তানভীর আহমদ দুলাল, হেমায়েত উদ্দিন হিমু, ফজলে কাদের সোহেল এবং আমির হোসেন মৎস্যজীবীদলের শীর্ষ পদে আসতে পারেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফর রহমান কাজল বলেন, সম্মেলন বা গঠনতন্ত্র মোতাবেক মৎস্যজীবী দলের নতুন কমিটি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যখনই বলবেন তখনই সম্মেলন করা যাবে। আমরা প্রস্তুত আছি। তবে সাংগঠনিক নিয়ম ভঙ্গের ব্যাপারে কারো বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে সেটা খতিয়ে দেখা হবে। মৎস্যজীবী দলের সদস্যসচিব মো: আবদুর রহিম বলেন, দলের হাইকমান্ড আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে আমি তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। আগামীতেও দল আমাকে যে দায়িত্ব দেবে তা পালনের জন্য আমি সর্বদা প্রস্তুত।