শারীরিক প্রতিবন্ধী মহিউদ্দিন, ৮৫’র কোটায় বয়স তার। এই বয়সে তিনি ২০-২৫ বার নদীতে নিজের বাড়ি ভাঙার দৃশ্য দেখেছেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে একটি সাজানো বাড়ি চোখের নিমিষেই ব্রহ্মপুত্রের গহীন তলে তরিয়ে যায়। ওই নদের ভয়াল থাবায় প্রতি বছরই তাকে গ্রাম থেকে গ্রামে, মাঠ থেকে ঘাটে, প্রান্তর থেকে প্রান্তরে বিতাড়িত হয়েছেন।
এবার আগাম বন্যায়ও তিনি হারিয়েছেন মাথা গুঁজার শেষ সম্বলটুকু। আশ্রয় নিয়েছেন দূর-সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে। মামা আব্দুল জলিলও বয়সের ভাড়েও নুয়ে পড়েছেন। তিনিই মহিউদ্দিনকে ভাঙা একটি ঘর ছেড়ে দিয়েছেন থাকার জন্য। জরাজীর্ণ ঘর, কর্দমাক্ত মেঝে। আশ্রিতের বাড়িতেও থাকার কোনো উপায় নেই তার। এক পাশে উনুনটা কর্দমাক্ত। চৌকির ওপরে কিছু লাকড়ি ও কিছু ধানের খড়। পানি আর না বাড়লেও আরো তিন-চার সপ্তাহ তাকে এখানেই থাকতে হবে। আর যাবেনই বা কোথায়? খাবারের নিশ্চয়তা নেই। আশপাশে কেউ এসে কোনো দিন খাবার দিলে কিছুটা হলেও পেটে দানাপানি পড়ে। তা না হলে উপোষ করেই তাকে থাকতে হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উজান থেকে নেমে আশা পাহাড়ি ঢল নামতে শুরু করেছে। সদ্য তলিয়ে যাওয়া কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে পানি সরতে শুরু করেছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ার চরেও ফিরে যাবে তাদের ফেলে আসা অবশিষ্ট ভিটেতে।
নদের ঢেউ খেলানো ঘোলাপানির দিকে তাকিয়ে এক সময় তিনি স্বপ্ন দেখতেন। বেঁচে থাকার প্রেরণা পেতেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন আর তার চোখে কোনো স্বাপ্ন নেই। বেঁচে থাকারও কোনো প্রেরণা পান না তিনি। দুই চোখ ভরা শুধু হতাশা। নদের পাড়ে বসে অবাক তাকিয়ে তিনি শুধু এখন অপেক্ষায় থাকেন পশ্চিম আকাশে তার জীবন সূর্যটা কবে ডুবে যাবে।