ভোলায় রোববার (৩১ জুলাই) বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের বাধার জেরে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আ: রহিমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে রহিমের মৃত্যুর জন্য ভোলা জেলা পুলিশ ও জেলা বিএনপি পরস্পরকে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন করেছে।

সোমবার দুপুরে নিহত আব্দুর রহিমের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতম।

সোমবার বিকেলে দ্বিতীয় জানাযা শেষে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে ভোলায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর ও সম্পাদক হারুন অর রশিদ ট্রুম্যানসহ বিএনপির ৪ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে দুটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাতে ভোলা সদর মডেল থানায় এ দুটি মামলা দায়ের করা হয়।

ভোলা সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শ (এসআই) মো: জসিম পুলিশের ওপর হামলা এবং স্বেচ্ছাসেবক দল কর্মী আবদুর রহিম হত্যার ঘটনায় এ মামলা দায়ের করেন। এতে নাম উল্লেখ করে ৭৫ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সোমবার পর্যন্ত ১০৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়াও অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

সোমবার দুপুরে ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ সরদার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আ: রহিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা আরেকটি মামলার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর।

সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে ভোলা জেলা বিএনপির কার্যালয়। মামলা আতংক বিরাজ করছে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মাঝে। এই ঘটনার পরে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা বিএনপি কার্যালয়ের আশপাশে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা।

রহিমের মৃত্যুর জন্য জেলা পুলিশ বিএনপিকে দায়ী করছে আর বিএনপি দায়ী করছে পুলিশকে। এ ঘটনায় পুলিশ ভোলা থানায় হত্যা মামলাসহ পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে বিএনপির ৭৫ নেতাকর্মী ও অজ্ঞাত ৩০০ ব্যক্তিকে আসামি করে পৃথক দুটি মামলা করেছে।

পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত রহিম মাতাব্বরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভোলা জেলা বিএনপি এবং পুলিশ পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে। জেলা বিএনপি সভাপতির দাবি, পুলিশ টিয়ারশেল লাঠিচার্জ আর গুলি করায় রহিমের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ সুপার বলছেন, শর্টগানের গুলিতে কেউ মারা যাবার কথা নয়। ইট বা অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত পাওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে নিহত আব্দুর রহিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমানের পক্ষে আজ দুপুরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন নিহত রহিমের পরিবারের খোঁজ-খবর নেন এবং সমবেদনা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তিনি।

এ সময় বিলকিস জাহান বলেন, আমরা সাধারণ জনগণের দাবি নিয়ে সারাদেশের মতো ভোলাতেও অব্যাহত লোডশেডিং ও জ্বালানি অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা চালিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রহিম প্রাণ হারায়। পুলিশের হামলায় বিএনপির কয়েক শ’ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজে মুমূর্ষ অবস্থায় ২২ জন ভর্তি রয়েছে। ঢাকাতে ভোলা জেলা ছাত্রদলের নুরে আলম আশঙ্কাজনক অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে ভর্তি রয়েছে। উল্টো বিএনপির ঘারে দোষ চাপিয়ে পুলিশ বলছে, বিএনপি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছে। যেখানে বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে পালন করতে পারে না, রাজপথে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো সুযোগ দেয়া হয় না, সেখানে কিভাবে বিএনপি অস্ত্র নিয়ে মাঠে থাকতে পারে?

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, বিএনপি যদি অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামতো তাহলে কোনো পুলিশ সদস্য হাসপাতালে ভর্তি নেই কেন? বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীরা যদি হামলা করতো তাহলে পুলিশের লোকজন হাসপাতালে ভর্তি থাকার কথা। এতে এটাই প্রমাণ হয় বিনা কারণে বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ এই হামলা চালিয়েছে। আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।

জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বলেন, নিহত রহিম মাতাব্বরের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর জানাযার আয়োজন করেছে বিএনপি। পুলিশের নির্যাতনে আজ আমরা এক ভাইকে হারিয়েছি। আমাদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই ঘটনার পর থেকে কর্মীরা আরো শক্তিশালী হয়ে কর্মসূচি পালন করবে।

তিনি আরো বলেন, ভোলায় আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছি। বিগত ১০ বছরেও এ ধরনের হামলার নজির নেই। আমরা পুলিশের অনুমতি নিয়েই আন্দোলন করি। আজ অতিউৎসাহী কিছু পুলিশ আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা করে মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করছে। এতে আমাদের মনোবল আরো শক্তিশালী হয়ে আগামী দিনে সকল কর্মসূচিতে সোচ্চার হবো। কালকের ঘটনার পর থেকে পুলিশ পুরো জেলায় নেতাকর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এতে নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে পারছে না।

পুলিশের মামলার পরিপ্রেক্ষিত ভোলা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশীদ ট্রুম্যান বলেন, আমরাও পুলিশে বিরুদ্ধে একটি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। হামলা করলো পুলিশ, আর মামলা করে আমাদের বিরুদ্ধে!

জানাজায় জেলা বিএনপির সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ ট্রুম্যান, যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোপান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি খন্দকার আল আমিন, জেলা যুবদলের সভাপতি জামাল উদ্দিন লিটনসহ দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

নিহতের স্ত্রী খাদিজা বিবি বলেন, আমার স্বামী বিএনপিকে ভালোবাসতো, গতকাল সে মিছিলে এসেছিলো, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে, আমি এ হত্যার বিচার চাই। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনার ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নামে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এনে বিএনপি অফিসের সামনে এনে জড়ো করে। তারা সমাবেশ শেষে লোকজন নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। বিএনপির মিছিল করার অনুমতি ছিল না, তারপরেও তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের উপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে তারা পুলিশের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেছে। পুলিশ ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি, তিনি মারা গিয়েছেন ইটের আঘাতে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। দুই মামলায় আসামি চার শতাধিক।

উল্লেখ্য, রোরবার বিএনপি কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে জেলা বিএনপির প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিম নিহত ও পুলিশসহ শতাধিক আহত হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঘটনার পর শহর জুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।