সামনাসামনি যা করছেন আপনি তো আমার চাকরি খাবেন, এই শোনেন, যা দেখাইছি ওইটা দিতে হবে, তাহলে আপনি কাজ পেয়ে যাবেন। ভাইঙা ভাইঙা টাকা দিলে এটা অয়না। তারপরও দিয়ে গেলেন! ওই ভাই সামনে ছিল (পাশে বসে কথা বলতে থাকা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে), তাই আমি রাখলাম, নাইলে রাখতাম না। কিন্তু দেওয়া লাগব, ওইটা না দিলে আপনার খারিজ (নামজারি) হবে না।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের কানিহারী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোসাম্মৎ নাছরীন সুলতানা নিজ অফিসে প্রকাশ্যে দরকষাকষি করে ঘুষ নিচ্ছিলেন। সম্প্রতি বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে ঘুষের টাকা লেনদেনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীরা পোস্ট করলে তা ভাইরাল হয়। ঘটনার পরদিন ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, ত্রিশাল উপজেলার কানিহারী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছরীন সুলতানা তার অফিসে নামজারি করতে আসা এক ব্যক্তির সাথে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেয়ার জন্য দর-কষাকষি করছেন। একপর্যায়ে হাসিভরা মুখে টাকা হাতে নিতে নিতে তাকে বলতে শোনা যায় ‘আপনি তো আমার চাকরি খাবেন। সামনাসামনি যা করছেন!’


একহাতে টাকা নাড়তে নাড়তে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছরীন সুলতানা হাসিমুখে বলতে থাকেন ‘আমার চাকরিটা খাওয়ার জন্য আপনি লাগছেন! এই শোনেন, যা দেখাইছি ওইটা দিতে হবে, তাহলে আপনি কাজ পেয়ে যাবেন। ভাইঙা ভাইঙা টাকা দিলে এটা অয়না। তারপরও দিয়ে গেলেন! ওই ভাই সামনে ছিল (পাশে বসে কথা বলতে থাকা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে), তাই আমি রাখলাম, নাইলে রাখতাম না। কিন্তু দেওয়া লাগব, ওইটা না দিলে আপনার খারিজ (নামজারি) হবে না।’
দুই দিন পরে বাকি টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তি দু’টি নামজারির জন্য ১৬ হাজার টাকা দেবেন জানালে আবার ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘না এইতো অইতনা, এইতা বাংলা আলাপ কইরেন না।’
নামজারি করতে আসা ওই ব্যক্তির সাথে কথোপকথনে আরো দেখা যায়, ওই ভূমি কর্মকর্তা ইশারা ইঙ্গিতে টাকার পরিমাণ বোঝানোর চেষ্টা করছেন। নামজারি করতে যে টাকা দাবি করছেন, সেটি ক্যালকুলেটরে লিখে ওই ব্যক্তিকে দেখান এবং বলেন এটা লাগবে।
সম্পূর্ণ কথোপকথন থেকে জানা যায়, দু’টি নামজারির জন্য বাধ্য হয়ে ওই ব্যক্তি ১০ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেও ভূমি কর্মকর্তা দাবি করছেন ১৬ হাজার টাকা। কথোপকথনের সময় পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটিকে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই নামজারি করার জন্য উৎসাহিত করতে দেখা যায়। এ সময় তিনি ‘ন্যায্য ও নির্ধারিত টাকায়, নিয়ম মেনে’ অফিসে কাজ করতে গেলে যে ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তা বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার ওই ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসন। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে নাছরীন সুলতানার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও সরকারি বিধি মোতাবেক সাময়িকভাবে বরখাস্তকরণের আদেশ দিয়েছেন।
ওই দিকে মঙ্গলবার সকালে নাছরীন সুলতানা অফিসে এসে জনতার তোপের মুখে পড়েন। ঘুষ গ্রহণের ভিডিও দেখে ভুক্তভোগীরা ভিড় জমান তার অফিসে। এ সময় অফিস সহকারীর সহযোগিতায় দ্রুত অফিস থেকে পলায়ন করলে জনতার রোষানল থেকে রক্ষা পান এ কর্মকর্তা। এসময় ভুক্তভোগীরা তাদের ঘুষের টাকা ফেরতে দাবি জানান।
উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি হাসান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে তদন্তের মাধ্যমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে।