মো. মিজান আলী ওরফে সলেমান ল্যাংটা। তার বয়স মাত্র ২৮ বছর। তিনি ঢাকার আড়াই হাজার বেলকুনির ল্যাংটা বাবার মুরিদ। তাছাড়াও তিনি বেশ কয়েকজন পরীরের মুরিদ বলে নিজেকে দাবি করেন। যেকারণে তাকেও গ্রামবাসী ল্যাংটা বাবা নামে ডাকে। সলেমান ল্যাংটা কৃষিকাজের পাশাপশি নিজ বসতঘরের পাশে একটি চায়ের দোকান করেন। জীবিকার তাগিদে কিছু দিন আগে উদ্যোগ নেন বিদেশে যাওয়ার। পরে একটি এনজিও থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ওই টাকা রাখেন দোকানে ভিতর গোপন জায়গায়।

গত ১৯ অক্টোবর রাতের আধারে দোকানে থাকা ঋণের টাকাসহ মোট এক লাখ ৪০ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায় চোর। দোকানে নেই সিসি ক্যামেরা ও নেই নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ। তাই অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোনো কূলকিনারা না পেয়ে চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পেতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন সলেমান ল্যাংটা। দোকানের সামনে ৩১ অক্টোবর স্থানীয় মাতুব্বরদের নিয়ে বসান সালিস। সেখানে সবার সামনে সলেমান ল্যাংটা হুমকি দিয়ে বলেন, তিন দিনের মধ্যে টাকা ফেরত না পেলে আমি খুর চালান দেব। এতে কারো ক্ষতি হলেও আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবেন না।

তার এমন হুমকির সাথে তাল দেন স্থানীয় মাতুব্বররাও। হুমকির পর রাতের আঁধারে সলেমান ল্যাংটা বাড়ির ওঠানে ৫৫ হাজার ফেলে রেখে যায় চোর। পরে বাকি টাকা ফিরে পেতে ৬ নভেম্বর ওই দোকানের সামনে আবারো সালিস বসায় তিনি। ওই সালিসে সিদ্ধান্ত হয় আগামী ১২ নভেম্বরের মধ্যে অজ্ঞাত চোর যদি বাকি টাকা ফেরত না দেয়, তাহলে খুর চালান দেয়া হবে। তাতে চোরের মাথার চুল থাকবে না। এমনকি মারাও যেতে পারে। তবে এবার আর হুমকি কাজ হয়নি এখনো। আজ মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) বিকাল পর্যন্ত কেউ টাকা ফেলে রেখে যায়নি। তাই টাকা ফেরতের অপেক্ষা আছেন সলেমান ল্যাংটা।

মিজান আলী ওরফে সলেমান ল্যাংটা ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের কাজীর বল্লভদী গ্রামের হাসেম ফকিরের ছেলে। ওই গ্রামের আজিম মোড়ে সলেমান ল্যাংটার বসতঘর। সেখানেই তার চায়ের দোকান। খুর চালান দেয়ার বিষয়টি নিয়ে এলাকায় পুরোদস্তুর চলছে তুলকালাম। খুর চালান কিভাবে দেয় তা কেউ বলতে পারিনি। এটার কার্যকারিতাও স্বচোখে দেখেনি কেউ। যেকারণে খুর চালান নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে সলেমান ল্যাংটার কাছে চুরি ও টাকা উদ্ধারের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি কৃষক। সর্বপ্রথম আমি হলো রহমাতুল্লিল আলআমিনের গোলাম। আমি পীর আউলীয়াকে ভালোবাসি। তাই আমি ল্যাংটা নামের উপাধি পাইছি। আমি ১৮ হাজার মাখলুকাতের বাতি জ্বালাই। আপনার বাতিও আমার মাধ্যমে জ্বলে। সবাই আমার, আমি সবার। আমার মা-বাবার দোয়া নিয়ে আমি দেশের বাইরে (মালয়েশিয়া) যাত্রা করতে চাইছিলাম। এই জন্য আমি এনজিও থেকে লোন ওঠাই। ঘটনার দিন আমি গেছিলাম বিদেশে যাওয়ার ট্রেনিংয়ে। আমার বোন টাকাগুলো এনে দোকানে রেখেছিল। রাত ৩ টার দিকে ফোন পাই যে আমার টাকাগুলো দোকান থেকে চুরি হয়ে গেছে।'

তিনি বলেন, 'পরে আমি স্থানীয়দের নিয়ে সালিসে বসি। সেখানে সকলকে অবগত করে ফকিরের মাধ্যমে খুর চালান দিতে চাই। এ খবর পেয়ে রাতের আঁধারে চোর ৫৫ হাজার টাকা আমার বাড়ির ওঠানে ফেলে রেখে যায়। বাকি টাকা এখনো পাইনি। টাকা ফেরত না পেলে খুর চালান দেব। খুর চালান দেয়ার জন্য ঢাকার একজন ফকিরকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ঠিক করেছি। পুলিশের কাছে না গিয়ে ফকিরের কাছে কেন গেলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো চোর কে জানি না। তাই ফকিরের মাধ্যমে চোর সনাক্ত ও টাকা উদ্ধার করবো।'

সমেলান ল্যাংটার বোন তাসলিমা বেগম বলেন, আমার ভাই বাড়িতে না থাকায় কিস্তির এক লাখ ৪০ হাজার টাকা দোকানে নিয়ে রাখি। রাতে আমি দোকান খোলা রেখে খাওয়ার ঘরে গেলে চোর দোকানে ঢুকে লুকিয়ে থাকে। পরে আমি দোকান বন্ধ করে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। তখন চোর টাকাগুলো নিয়ে ভিতর থেকে দোকান খুলে পালিয়ে যায়। রাত ৩টার দিকে ওঠে দেখি দোকান খোলা ও লাইট জ্বলছে। পরে স্থানীয়দের ডেকে খুর চালানোর ভয় দেখালে চোর ৫৫ হাজার টাকা ফেরত দেয়।

সালিসে উপস্থিত থাকা মাতুব্বর আবু হুরাইরা বলেন, 'আমরা সবাই সালিসে বসে ঘোষণা দিয়েছি যে টাকাগুলো নিয়েছে, সে যদি এক সপ্তাহের ভিতরে টাকাগুলো ফেরত না দেয় তাহলে ঘুর চালান দেওয়া হবে। সালিস হওয়ার ৬ দিনের মাথায় ৫৫ হাজার টাকা বাড়ির ভেতরে ফেলে রেখে যায় চোর। বাকি টাকার জন্য আবারও সালিসে বসি। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় আগামী ১২ নভেম্বরের মধ্যে বাকি টাকাগুলো ফেরত না দিলে আবারো সবাইকে ডেকে সবার সামনে খুর চালান দেয়া হবে। খুর চালান দিলে চোরের মাথার চুলসহ সমস্ত শরীরের পশম পড়ে যাবে।'
খুর চালানে কী কোনো কাজ হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দেখি নাই। তবে শুনেছি। '

স্থানীয় খালেক মোল্যা ও আবুল বাসার বলেন, 'খুর চালান, চটি চালান ও বাটি চালান দেয়ার বিষয় সারাজীবন শুনেছি। আসলে বাস্তবে দেখেনি কোনো। আমাদের কাছে মনে হয় এসব ভুয়া। চালান দেওয়ার বিষয়টি আসলে অপরাধীদের ভয় দেখানো ছাড়া কিছুই না।'

উপজেলার পুরুরা উত্তরপাড়া মাজে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, 'এসব বিষয়গুলো নিয়ে দালিলিক ভিত্তিহীন। শরিয়তও এটাকে সমর্থন করে না। এসব চালান আসলে কুফরি কালামের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে। চালানের মাধ্যমে আসলে ভয় দেখানো হয়। ভয়ের কারণে অনেক সময় চুরির ঘটনা অনেকেই স্বীকার করে। '