পেশাগত কারণে ইটভাটার শ্রমিকদের সন্তানদের স্কুলে যাওয়া হয়ে উঠে না। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি; কোনো রকম দু’বেলা দুমুঠো খাবারের জন্য এতটা সংগ্রাম করতে হয় তাদের। ইটভাটায় শিশু শ্রমেরও অভিযোগ অনেক আগে থেকেই। এমন বাস্তবতায় ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ইটভাটার শিশুদের শিশু শ্রম বন্ধ করে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

গত পাঁচ বছর ধরে তরুণ প্রজন্ম নামে সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে ইটভাটার শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য এ শিক্ষার ব্যভস্থা করেছে। নাম, দেয়া হয়েছে বর্ণমালা।

জানা গেছে, বর্ণমালা স্কুলের মাধ্যমে পাঠে মনোযোগী হয়ে শিখছে ইটভাটার শিশুরা। যেখানে পড়াশুনার সুযোগ পাচ্ছে প্রায় দু’শতাধিক শিশু। দুপুর ৩টা থেকে এ শিক্ষার কার্যক্রম শুরু চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। নবাবগঞ্জ উপজেলার চালনাই সড়ক, ভাওয়াইলা ও ইসলামপুরে তিনটি শাখা রয়েছে।

২০১৮ সালে চালু হওয়া এ স্কুলে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত কার্যক্রম চলে। নবাবগঞ্জে চারটি ইটভাটার প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী বর্ণমালা স্কুলে বিনামুল্যে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ইটভাটার শ্রমিকেরা সাধারণত বছরের ছয় মাস থাকে কর্মস্থলে বাকি ছয় মাস থাকে নিজ এলাকায়। যার কারণে তাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করা হয়ে উঠে না।

বিশ্ববিদ্যায়ের দুই বন্ধু অভিষেক পাল অন্তু ও মো: জামান বিকেলে ঘুরতে বেরিয়ে দেখেন ইটভাটায় শিশুশ্রম। তখন তারা তারা পরামর্শ করে শিশুদের ঝুকিপূর্ণ কাজ থেকে বের করে তাদের জন্য একটি স্কুল করার কথা ভাবেন। অন্য বন্ধুদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় স্কুল নির্মাণের। দেরি না করে ওই বছরের ১ ডিসেম্বর দোহার নবাবগঞ্জ তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা অস্থায়ীভাবে টিনশেড তৈরি দিয়ে ‘বর্ণমালা’ নাম দিয়ে স্বপ্নের যাত্রা শুরু করে বর্ণমালা স্কুল। এক বছর পর ইসলামপুর ও ভাওয়াইলা এলাকার ইটভাটার শিশুদের জন্য আরো দুটি স্কুল করা হয়। এরপর থেকেই শিশুরা বর্ণমালা শিখছে।

জানা গেছে, এখানে কেউ কেউ পড়াশোনায় অনেক দূর এগিয়েছে। বর্ণমালায় হাতেখড়ির হওয়ার পর কারো কারো হাতের লেখা এতই সুন্দর যা দেখে অবাক হতে হয়েছে! বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধা পর্যন্ত চলে ক্লাস।

বর্ণমালা স্কুলে কোনোরকম আর্থিক সুবিধা ছাড়াই শিশুদেরকে শিক্ষাদানের কাজটি করে যাচ্ছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মোমেন মুন্না, রাজিব হোসেন, আওলাদ, গালিব, আরিফ হোসেন, জান্নাতুল ফেরদৌস মৌ ও পিংকি আক্তার শুরু থেকে নিয়মিতভাবে পাঠাদান করছেন।

বর্ণমালার শিক্ষক মোমেন মুন্না জানান, নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি বর্ণমালার শিশুদেরকে পাঠদান করাচ্ছি। ওদেরকে পাঠদান করাতে পেরে আমি আনন্দিত।

পাপিয়া আক্তার নামে এ শিশুর অভিভাবক জানান, বছরের ছয় মাস আমরা থাকি নিজ এলাকায় আর বাকি ছয় মাস কর্মস্থলে। ফলে শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো হয় না। বর্ণমালা হাতে কলমে যে শিক্ষা দিচ্ছে তাতে শিশুরা শিখছে ।

বর্ণমালার স্কুলের অন্যতম উদ্যোগতা মোঃ জামান জানান, ভালো কিছু করার চিন্তা থেকেই আমাদের এই স্কুলের অগ্রযাত্রা। এখানে শিশুরা শিশুশ্রম বন্ধ করে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে তা দেখে খুবই ভালো লাগছে। ওদের জন্য আরো ভালো কিছু করার ইচ্ছা আছে। তবে বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ভবিষ্যতে পূর্নাঙ্গ স্কুলের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।