নরসিংদীতে মাদরাসার জমি অধিগ্রহণের প্রায় দেড় কোটি টাকা প্রতারণা করে অত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে যুবলীগের তিন নেতার বিরুদ্ধে। সরকারি ক্ষতিপূরণের এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা থেকে মাদরাসাকে ৫৩ লাখ টাকা দিয়ে বাকি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যুবলীগ নেতা আকরাম হোসেন, আব্দুল মান্নান ও দেলোয়ার হোসেন। ঘটনাটি ঘটেছে জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের কাজিরচর গ্রামে।
জানা যায়, নরসিংদী পলাশের ডাংগা ইউনিয়নে এ কে খান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও টার্মিনালে যাতায়াতের জন্য সড়ক বিভাগ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা (এক হাজার ৪৮৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা) ব্যয়ে ‘পাঁচদোনা-ডাংগা-ঘোড়াশাল জেলা মহাসড়ককে এক স্তর নিচু দিয়ে উভয় পাশে পৃথক সার্ভিসলাইনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ (ডাংগাবাজার-ইসলামপুর লিংকসহ) সড়ক নির্মাণ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় পাঁচদোনা ডাংগা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে ডাংগা ইউনিয়নের কাজিরচর ও ইসলামপুর খেয়াঘাট পর্যন্ত সড়কের পাশে জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কাজিরচর এলাকার আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া কাজিরচর দারুস সুন্নাহ মাদরাসা ও এতিমখানার কিছু জমিসহ একটি দ্বিতল ভবন অধিগ্রহণ করতে হয় সরকারকে। এর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা দেয় মাদরাসাকে।


তবে এই ক্ষতিপূরণের পুরো টাকা নিতে পারেনি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। এর আগেই ক্ষতিপূরণের এক কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়ে দিতে হয়েছে যুবলীগ নেতা আকরাম হোসেন, আব্দুল মান্নান ও দেলোয়ার হোসেনকে। জমি অধিগ্রহণের আগেই মাত্র ৪০ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তিতে জমিসহ ভবন কিনে নেয় চরসিন্দুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আকরাম হোসেন, পলাশ উপজেলা যুবলীগের দফতর সম্পাদক আব্দুল মান্নান ও ডাংগা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। তারা মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে ভুল বুঝিয়ে রাস্তার পাশে জমি ও ভবন পড়ায় এমনিতেই তা সরিয়ে ফেলতে হবে বলে অল্প টাকায় এটি কিনে নেয়। পরে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে দিয়ে সরকারে কাছে জমি ও ভবন বিক্রি করে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা বিল করে সেখান থেকে মাদরাসার চুক্তি বাবদ ৪০ লাখ টাকা ও অন্য একটি জমি বাবদ আরো ১৩ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ৫৩ লাখ টাকা দিয়ে বাকি টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। এতে করে বড় ধরনের প্রতারণার মুখে পড়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। জামিয়াতুল ইসলামিয়া কাজিরচর দারুস সুন্নাহ মাদরাসা ও এতিমখানার সদস্যসচিব ও সুপার এমদাদুল হক বলেন, জমি অধিগ্রহণে মাদরাসার সামনের অংশে ১১ শতাংশ জমিসহ একটি দ্বিতল ভবন পড়ে। এটি বিক্রির জন্য যুবলীগ নেতা আকরাম, দেলোয়ার ও আব্দুল মান্নান প্রস্তাব দেয়। তারা ৪০ লাখ টাকা দাম নির্ধারণ করে। পরে সভাপতির সাথে আলোচনা করে তা তাদের কাছে মৌখিক চুক্তিতে বিক্রি করে দিই। তারা এ বাবদ ১০ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়। পরে বাকি টাকা তারা সরকার থেকে বিল উঠিয়ে পরিশোধ করবে বলেছিল; কিন্তু এত টাকা বিল আসবে তা আমরা কখনো ভাবিনি। তাদের চুক্তি অনুযায়ী আমরা গত ৮ সেপ্টেম্বর আকরামের নামে এক কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ৬৩৮ টাকার একটি চেক লিখে দিই। মাদরাসার সভাপতি আব্দুস সলাম বলেন, আমরা জানতামই না যে, সরকার এই জমি তিন গুণ দামে কিনে নেবে। তারা আমাদের বলেছিল জমি ভবন যে হেতু সড়কে পড়েছে এগুলো এমনিতেই সরিয়ে ফেলতে হবে। তাই যা খরচ হয়েছে সেই হিসাব করে বিক্রি করেছিলাম; কিন্তু সরকারের কাছ থেকে বিল উঠিয়ে দেখলাম আমরা বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছি, যা মাদরাসার বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াল।


এ বিষয়ে ডাংগা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সাবের উল হাই বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক। মসজিদ-মাদরাসা আর এতিমখানার মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করতে নেই। এগুলো সমাজের সবার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। মাদরাসা সুপারকে বলেছিলাম টাকাগুলো তাদেরকে না দেয়ার জন্য; কিন্তু তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকাগুলো নিয়ে নেয়। এই ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এতে পুনরায় মাদরাসার টাকা ফেরত দেয়া হোক। এসব বিষয়ে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা আকরাম হোসেন ও আব্দুল মান্নান জানান, তারা কোনো মাদরাসার জমি ও ভবন কেনেনি। যদি কিনে থাকত তবে কাগজপত্র থাকত। নরসিংদী জেলা প্রশাসক আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান বলেন, ঘটনাটি আমি শুনেছি। এটি সম্পূর্ণ মাদরাসার বিষয়। কারণ সরকার সরাসারি মাদরাসাকে ক্ষতিপূরণে টাকা দিয়েছে। তারা টাকা পাওয়ার পর সেই টাকা কাকে দেবে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। তবে তাদের সাথে প্রতারণা করা হলে এ বিষয়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে।