ময়মনসিংহের ভালুকায় পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে সিসা গলানোর কারাখানা। এসব কারখানায় নষ্ট ও বাতিল ব্যাটারি এবং পুরোনো লোহার বর্জ্য এনে গলানো হচ্ছে। বর্জ্য গলানোর সময় এর ক্ষতিকারক ধোঁয়ায় ক্ষতি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের, দূষিত হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, নষ্ট হচ্ছে ফসল ও জমি। পাশাপাশি এখানে কর্মরত কর্মচারীরাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। শুধু তাই-ই নয়, সিসা কারখানার আশপাশে জন্মানো ঘাস খেয়ে হুমকির মুখে পড়ছে পশুপাখিও। কারখানার বিষাক্ত পরিবেশের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গৃহপালিত ও বন্য পশুপাখির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।


স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের পাইলাব গ্রামের আরগুণা নামক স্থানে স্লুইস গেটের দক্ষিণপাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে পুরনো ব্যাটারির সিসা পোড়ানোর কাজ। এতে কারখানায় পোড়ানো ব্যাটারির অ্যাসিডের উৎকট গন্ধে লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। এর বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কারখানাটির আশপাশের ঘাস খেয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গরু ছাগলের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে ফসলি জমি ও গাছপালা। এমনটিই অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় জয়নাল মিয়া জানান, কারখানার আশপাশের ঘাস খেয়ে তার একটি ষাড় ও মুনসুর আলীর বাছরসহ একটি গাভী মারা গেছে। এ ছাড়া শ্রীপুর উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের অনেকেরই গৃহপালিত পশুও মারা গেছে বলে তিনি জানান।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরো কয়েকজন জানান, স্থানীয় এক প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় টিনের বেড়া দিয়ে সাইনবোর্ড বিহিন গড়ে উঠা ওই কারখানাটিতে দীর্ঘদিন ধরেই পুরনো ব্যাটারি থেকে সিসা পোড়ানো হচ্ছে। এতে কারখানার আশপাশের তিন কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষেতের ধানের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি গাছপালা ও সবজির ক্ষতি হচ্ছে। অনেকের শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক নানান জটিলতা দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে সিসা কারখানাটি বন্ধসহ সিসা তৈরিতে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান এলাকাবাসী।
জানা যায়, সিসার কারখানা করতে হলে অবশ্যই পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি লাগবে। এয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান লাগে। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া বা প্ল্যান ছাড়া কোনো সিসা কারখানা চালায় তাহলে তাকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা দুই বছর থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।


উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুল হোসাইন বলেন, সিসা পোড়ানো ধোঁয়ার কারণে মানুষের থাইরয়েডের সমস্যাটা বেশি হয়। এটি শিশুদের মেধা বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, ফুসফুসে সমস্যা ও রক্তশূন্যতার সৃষ্টি করে। গর্ভবতী মহিলাদের জন্যও এটি ক্ষতিকর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর শিশুদের জন্য। এ সকল কারখানায় যেসব শ্রমিক কাজ করেন তাদের জীবনও মারাত্মক হুমকির মুখে থাকে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, সিসা ফ্যাক্টরি পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। অবিলম্বে অবৈধ ওই ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়া উচিত।
উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মুনসুরুল হক জানান, সিসা কারখানার আশপাশে জন্মানো ঘাস খেলে গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগবালাইসহ মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। তিনি কারখানাটি বন্ধের বিয়য়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন বলে জানান।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাদশা জানান, ওই এলাকায় তার তেমন আসা যাওয়া নেই। তাই তিনি বিষয়টি জানেন না। খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সুমাইয়া আক্তার জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিবেশ অধিদফতর ময়মনসিংহের পরিচালক দিলরুবা ইয়াসমিনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।