বগুড়ার শাজাহানপুরে উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় তিন ফসলি জমির মাটি গিলে খাচ্ছে অর্ধশত ইটভাটা। বছরের পর বছর ইটভাটাগুলো এভাবে চলতে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন এবং সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইটভাটা মালিকরা দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে কৃষকদের ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে রাতের আঁধারে তিন ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটায়।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনোক্রমেই তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ ছাড়া ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গ্রামের অভ্যন্তরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি, জনসমাগম স্থল, হাটবাজার ও বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদন হয় এমন জমিতে কোনোক্রমেই ইটভাটা করা যাবে না। এ ছাড়া ইটভাটার লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত ইটভাটার মালিক কর্তৃক ইট প্রস্তুতের মাটির উৎস উল্লেখ করে হলফনামা দাখিল করতে হবে। এর পর সব কিছু শেষ হওয়ার পর পরিবেশ অধিদফতর ও জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ইটভাটায় আগুন দিতে হবে। অথচ উপজেলার স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, হাটবাজার ঘেঁষে ও তিন ফসলি জমিতে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে অর্ধশত ইটভাটা।
স্থানীয়রা জানান, কিভাবে তিন ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামের অভ্যন্তরে ইটভাটা গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয় তা বোধগম্য নয়। তবে এলাকার ফসল উৎপাদন ও বসবাসে নানাবিধ ক্ষতির কারণে বিষয়টি নিয়ে তারা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে আবেদন ও প্রতিবাদ করলেও কোনো সমাধান পাননি।
সম্প্রতি পরিবেশ অধিদফতর অভিযান চালিয়ে ১০-১২টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়ে অর্ধকোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেসব আবার মেরামত করে ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। শুধু তাই নয়, উপজেলার এসব অবৈধ ইটভাটা রক্ষার্থে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ দিকে উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে, বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৬ হাজার ১৮০ হেক্টর। ইটভাটার সংখ্যা অর্ধশত হলেও পরিবেশ অধিদফতর বলেছে এসব ভাটার একটিরও কোনো অনুমোদন বা ছাড়পত্র নেই।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, উপজেলার দুবলাগাড়ী, খলীশাকান্দী, মাদলা, জালশুকা, সুজাবাদ ও নয়মাইল এলাকার জমিগুলো সবচেয়ে বেশি উর্বর ও তিন ফসলি। এসব জমিতে সারা বছর ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনেপাতাসহ সব ধরনের ফসল হয়। আর এখান থেকে প্রতি দিন শত শত ট্রাক কৃষিপণ্য ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, বর্তমানে এসব জমিতে চাষাবাদের পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে ইট। কৃষকরা বলছেন, ইটভাটা স্থাপনের পর থেকে তাদের জমিতে আগের মতো ফসল হয় না। ফসলে পোকামাকড় হয়। ধুলোবালি ও আগুনের তাপে গাছ মরে যায়। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসবের প্রতিবাদ করলে নানা হুমকির সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া এসব গ্রামের অভ্যন্তরে, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, হাটবাজার ঘেঁষে নির্মিত হয়েছে ইটভাটা। ফলে ইটভাটার আগুনের তাপ আর ধুলোবালিতে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও ক্লাসে বসে নিঃশ্বাস নেয়া হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ধুলোবালি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শ^াস-প্রশ্বাসজনিত রোগসহ নানাবিধ রোগ বেড়েছে। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে তিন ফসলি কৃষি জমি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ায় জমিগুলো ডোবা-নালা ও গর্তে পরিণত হয়েছে।
ইটভাটায় ক্ষতিগ্রস্ত খলিশাকান্দী গ্রামের কৃষক মোতাহার হোসেন জানান, ইটভাটা হওয়ার পর থেকে তাদের জমিগুলোতে ফসল ভালো হয় না। ফসলে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই লেগেই থাকে। উৎপাদন ঠিক মতো হয় না। এ জন্য তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদা খান বলেন, কৃষি জমির মাটি কাটার সংবাদ পেলে সেখানে যাওয়ার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। তবে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
শাজাহানপুরে ইটভাটা গিলে খাচ্ছে তিন ফসলি জমি
বগুড়ার শাজাহানপুরে উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় তিন ফসলি জমির মাটি গিলে খাচ্ছে অর্ধশত ইটভাটা। বছরের পর বছর ইটভাটাগুলো এভাবে চলতে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন...



