উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারসহ নানা দ্বন্দ্বে খুনোখুনির পরিমাণ বেড়েই চলছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ মিয়ানমারে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) ভেতরে বিভেদ ও আধিপত্য বিস্তার। এই বিভেদের কারণে দলছুট হচ্ছে কিছু সদস্য। তাদেরকে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীতে যোগদান ঠেকাতে এবং সংগঠনের গোপনীয়তা রক্ষা করতে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দলছুটদের খুন করছে আরসা। এ দিকে সাবেক সদস্যদের দলে নেয়ায় প্রতিপক্ষ আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গেও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে আরসা’র।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, তাদের প্রতিবেদন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও থানা সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র বলছে, গত ৪০ দিনে বিভিন্ন ক্যাম্পে খুন হওয়া ১৭ রোহিঙ্গার বেশির ভাগই আরসার সাবেক সদস্য। সুবিধাবঞ্চিত হয়ে তারা সংগঠনটির প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার ওরফে জুনুনির ওপর আর আস্থা রাখতে পারেনি। এমতাবস্থায় গত ১৪ এপ্রিল আরসা সদস্যদের সাথে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ১৮ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পুলিশ ও আরসা সদস্যদের গুলিতে নুর হাবা (৫০) নামে এক নারী পথচারী এবং পুলিশের গুলিতে আরসার সদস্য মো: হাসিম (৩২) নিহত হন। এ সময় দুই পুলিশ সদস্যও আহত হন। পুলিশ জানায়, নিহত আরসা সদস্য হাসিম চাঁদাবাজি ও মাদক পাচারসহ একাধিক মামলার আসামি। পথচারী নুর হাবা স্থানীয় নুরুল ইসলামের স্ত্রী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন আরসার একক আধিপত্য ছিল। কিন্তু আরসা ছেড়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দলে ভিড়িয়ে আরএসও অবস্থান শক্ত করছে। এ নিয়েও দুই সংগঠনের দ্বন্দ্বে খুনোখুনি বেড়েছে।
ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ বলেন, কে আরসা, কে আরাকান আর্মি, সেটা কোনো বিষয় নয়। আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে দেবো না। সেখানে যারাই অপরাধে জড়াবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ ছাড় পাবে না।
কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এর মাঝি আবু সালেহ বলেন, ক্যাম্পগুলোর প্রধান মাঝি ও আরসার মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। এ দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ আরসার ছায়াতল থেকে সরে আসার চেষ্টা। মাদক, অপহরণ, গুম, মুক্তিপণের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও দ্বন্দ্ব হয়। এসব কারণে আরসা অনুসারী মাঝিরা সংগঠন থেকে সরে আসছেন।
গত মাসে বালুখালী ৮-ইস্ট রোহিঙ্গা শিবিরে ‘আধিপত্য বিস্তার’ নিয়ে সশস্ত্র দুটি গোষ্ঠীর সংঘর্ষে দুই রোহিঙ্গা নিহত ও একজন গুলিবিদ্ধ হয়। তারাও আরসার সাবেক সদস্য। গত বুধবার রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হন। এপিবিএন বলছে, তিনি আরসা কমান্ডার। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র-গুলিসহ আরসার তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আরসা-আরএসও দ্বন্দ্ব
কয়েক মাস ধরেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্তে শূন্যরেখায় গোলাগুলি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, আরসা ও আরএসও সদস্যরা কোনারপাড়া শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। পরে তা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ছড়িয়ে পড়ছে। তমব্রু সীমান্তে শূন্য রেখায় গোলাগুলিতে আহত আরএসও সদস্য মুহিব উল্লাহর দাবি, ২০১৮ সাল থেকে টানা তিন বছর মিয়ানমারের পাহাড়ি এলাকায় তারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের সংগঠনের লক্ষ্য ‘আরকানের আজাদি’। নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। অন্য দিকে আরসা চায়, রোহিঙ্গাদেরকে আরসার সদস্য করতে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো ইউনিট মনে করে, রোহিঙ্গা শিবিরে আরসার অস্তিত্ব নেই। আবার কারো কারো মতে, শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল সংগঠনটি। তবে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ খুন হওয়ায় পর বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে ৪৬৭ জন আরসা সদস্যকে গ্রেফতার করে এপিবিএন। এপিবিএন সূত্র বলছে, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মোট ৩৪টি ক্যাম্পের সব কটিতে আরসা সক্রিয়। এর সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার। তবে আরসার প্রধান গণমাধ্যম বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরে আরসার সদস্য ১৬ হাজারেরও বেশি। পুলিশের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে ১৪৯ জন খুন হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। প্রথম দিকে আরসার সাথে জড়িত থাকা নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও সম্প্রতি দুই নেতা, তিন মাঝি, ছয় মুসল্লিসহ আরো অনেকে সরাসরি আরসার সাথে জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে আরএসও’র নামও এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি ক্যাম্পের হেড মাঝিরা অভিযোগ করেন, ক্যাম্পে রাতে ভারী ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় একটি গ্রুপ। এরা প্রতিটি ব্লকে গিয়ে যুবকদের তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দিতে বলে। কাউকে কাউকে যোগ দিতে বাধ্যও করা হয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফারুক আহমদ বলেন, এসবের পরও রোহিঙ্গা ক্যাম্প সম্পূর্ণরূপে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করছি।



