মোঃ বাহার হোসেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। পরিবারে তার স্ত্রী ও ছয় সন্তান নিয়ে আটজনের সংসার। সন্তানদের বড় চারটিই মেয়ে।
চার মেয়ের পরের দুটি পুত্র সন্তান। সজিব হোসেন আর জিহাদ হোসেন।
একাধিকবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে চরকালকিনি গ্রামের বাসিন্দা বাহার হোসেন এখন অনেকটা সহায় সম্বলহারা। অর্ধাহারে, অনাহারে থাকা হয় পরিবারের সদস্যদের।
সজিবের বয়স সাত আর জিহাদের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রতিদিনের মতো বাবার সাথে নদীতে পোনা শিকারে এসেছে ওরা।
সজিব নদীর ঢেউ মাড়িয়ে আর কিনারায় জালছেপে পানি মাড়িয়ে বাবা বাহারের 'সহযোগী' হয়ে ওঠছে। জাল টেনে কিছুক্ষণ পরপর আহরিত পোনা পাতিলে সংরক্ষণ করছে সে।
অন্যদিকে অবুঝ শিশু জিহাদ। তার জন্য মা-বাবার কোলই থাকার কথা নিরাপদ আবাসস্থল। একেবারেই শিশু, তাকে নিয়ে আসা হয় নদীতে, জীবিকার তাগিদে। অনাগত ভবিষ্যতের কঠিন জীবনের মুখোমুখি জিহাদের মতো নদী তীরের এমন শিশুদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
তাই তো জীবন যুদ্ধের এতসব ভাবনাকে বুঝে ওঠার আগেই পিছনে ফেলে ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়ে পড়েছে ও।
কাগজের তৈরি বিশেষ চামুচে পোনা সংগ্রহ করছেন বাহার হোসেন ও তার ছেলে সজিব। এরপাশেই ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট শিশু জিহাদ।
কথা হয় ওদের হতদরিদ্র পিতা বাহার হোসেনের সাথে, গতকাল সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ আনুমানিক ৮০০ পোনা আহরণ করেছেন তারা বাপ-বেটা মিলে। এর প্রতিটি পোনা এক টাকা করে দাদন ব্যবসায়ীরা আহরণকারী জেলেদের থেকে ক্রয় করছেন। এরপর পাইকাররা এসব পোনা খুলনা, সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে ২-২.৫০ টাকায় পোনাপ্রতি চালান করে থাকেন।
জেলেদের সাথে কথা বলে আরো জানা গেছে, এই পোনা আহরণকে ঘিরে মেঘনা নদীর তীরবর্তী লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নাছিরগঞ্জ, বাত্তিরঘাট, সাহেবেরহাট, লুধুয়া, পাটারীরহাটসহ বিভিন্ন মাছঘাট এলাকাকে ঘিরে দাদনব্যবসায়ী একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এসব সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে কমলনগর উপজেলার এক 'মাঝারি গোছের' জনপ্রতিনিধিকে সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মার্চ-এপ্রিল জুড়ে মেঘনা নদীতে সকল প্রকার জাল ফেলা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাল ফেলছে জেলেরা। নিষেধাজ্ঞাকালীন জেলেদের ভর্তুকি দিয়ে আসছে সরকার। কিন্তু ওই ভর্তুকির চাল বরাদ্দ ও বন্টনে রয়েছে নানা অনিয়ম দূর্ণীতি আর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের সুষ্ঠু তদারকি না থাকা, কিংবা অনৈতিক সুবিধার যোগসাজশে জেলে সহায়তা কার্ড প্রণয়ন করা হয়। এতে প্রকৃত জেলেরা হন বঞ্চিত।
নদীর জোয়ার-ভাটায় ঢেউয়ের আছড়ে পড়া পানিতে এসব সংগ্রামী জেলে বাহারদের গল্প যেন হারিয়ে না যায়। প্রতিষ্ঠিত হোক সুবিধা বঞ্চিত জেলে সম্প্রদায়ের ন্যায্য অধিকার।



