‘রাখাইন রাজ্যে বিশাল আয়োজনে ঈদ করেছি। ঈদের জামাত শেষে বাড়ি এসে সেমাই ও চালের রুটির সাথে গরুর গোশত খেয়েছি। আর এখন একটু সেমাইয়ের জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। এটা যে কত বেদনার, কত লজ্জার কী করে বোঝাবো। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে সহায় সম্বল ছেড়ে এ পাড়ে পালিয়ে এসেছি। বুকের এ ক্ষত, এ বেদনা ধরে রাখতে পারি না’- বেদনায় আপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন দিল নেওয়াজ।
ঈদের দিন এক দুঃসহ যন্ত্রণা ও দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন রোহিঙ্গারা। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার ঈদের আমেজ কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা গেছে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক মসজিদ-মক্তবে রোহিঙ্গারা ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মুনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা ।
সরেজমিন দেখা গেছে, সকালে টেকনাফের জাদিমুড়া, শালবন, নয়াপাড়া ও লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো রং-বেরংয়ের বেলুন ও ঈদ মোবারক লেখা ব্যানার দিয়ে গেট সাজানো। এসব ক্যাম্পে শিশুরা সকাল থেকেই সেজেগুজে, নতুন জামা-কাপড় পরে ক্যাম্পের রাস্তায় হৈ-হুল্লোড় করছে। রোহিঙ্গা তরুণরা চাঁদের গাড়ি (বিশেষ ধরনের জিপ) ভাড়া করে দলবদ্ধভাবে কক্সবাজার ও টেকনাফ সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গেছে। শিশুদের অনেকের হাতে প্লাস্টিকের খেলনা বন্দুকও দেখা গেছে। আবার অনেকে নতুন জামা, গেঞ্জি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি ও চশমা পরে দল বেঁধে নাগরদোলায় আনন্দে মেতে আছে।
টেকনাফে ক্যাম্প এলাকায় শিশুদের জন্য বেশ কয়েকটি জায়গায় নাগরদোলা বসেছে। এর আয়োজক নুর মোহাম্মদ বলেন, সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেই এ আয়োজন করেছি। রোহিঙ্গা শিশুরা আনন্দ উপভোগ করছে। এই মেলা কমপক্ষে তিন দিন থাকবে। গত বছরের তুলনায় শিশুরা এ বছর বেশি আনন্দ করছে।
জাদিমুড়া ক্যাম্পের রাস্তার পাশে বন্দুক বিক্রেতা রাফি আলম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রি বেশি। তা ছাড়া শিশুরা বন্দুক নিয়ে খেলতে বেশি পছন্দ করে। দুই বছর ধরে এ ব্যবসা চালাচ্ছি আমি।
এ বিষয়ে টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার ক্যাম্পে ঈদের আমেজ কিছুটা বেশি। আমার ক্যাম্পে ৩০টির বেশি ছোট-বড় ঈদের নামাজ হয়েছে।
লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর বশর বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরেছি। এ জন্য আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া। তবে নিজ দেশে (মিয়ানমারে) ঈদ উদযাপন করতে পারলে আমরা সব চেয়ে বেশি খুশি হতাম। আমাদের এখন একমাত্র স্বপ্ন মিয়ানমারে ঈদের নামাজ আদায় করা। তিনি আরো বলেন, আমরা দেশে যেভাবে ঈদ করতাম, এখানে সেভাবে ঈদ করতে পারি না। কারণ সব কিছুর পরও এটা আমাদের দেশ না।
টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ১৬-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোহাম্মদ জামাল পাশা বলেন, টেকনাফে সাতটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা ঈদ উদযাপন করেছে। তবে কেউ যাতে ক্যাম্পের বাইরে না যায়, সে জন্য মাঝিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে দিকেও নজরদারি রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফারুক আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্তিপূর্ণভাবেই ঈদের নামাজ সম্পন্ন হয়েছে। খুবই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল ক্যাম্পগুলো।



