পাবনায় নদী থেকে নির্বিচারে বালু তুলে রমরমা বাণিজ্য চলছে। একটি প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন নদীর তলদেশ থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার (খনন যন্ত্র) দিয়ে বালু তুলছে। এতে ভূ-অভ্যন্তরের অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় আগামী বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অধিক লাভজনক হওয়ায় বালু তোলার এই অশুভ তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না। দিনের বেলায় স্থানীয় প্রশাসন তৎপর থাকায় বালুদস্যুরা রাতের বেলা ড্রেজারের বাতি নিভিয়ে বালু তুলছে। ভলগেট ও বোমামেশিনসহ আরো নানা ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশের ২৫-৩০ ফুট গভীর থেকে বালু তোলায় ভূস্তর ও নদীর বেড লেভেল (তলদেশ) এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।
গত ৯০’র দশকের শেষ দিকে পাবনা জেলায় যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা শুরু হয়। পাবনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে অধিক পরিমাণে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ফাঁকা বা ভ্যাকুয়ামের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাত্র ৪-৫ মাত্রার ভূমি কম্পনেই এ অঞ্চলের বিশাল এলাকায় ধস নামতে পারে। সরেজমিনর দেখা যায়, যমুনা, হুড়াসাগর ও পদ্মা নদী থেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে কিছু বালু ব্যবসায়ী শুধু রাতের গভীরেই নয়, প্রকাশ্যেও বালু উত্তোলন করছেন। এতে নদী পাড়ের গ্রামগুলোর বাসতবাড়ি, ফসলি জমি, তীর সংরক্ষণ ও পুরাতন বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রেল স্টেশন এমনকি পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের টাওয়ারও ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিন আরো দেখা যায়, যমুনা নদী ও হুড়াসাগর নদের পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে বালু বেচাকেনার হাট বসেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু কেনাবেচা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, জেল জরিমানাতেও থামছে না এই অবৈধ বালু উত্তোলন ও বেচাকেনা। বিনা পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় প্রভাবশালী বালুসন্ত্রাসীরা জেল জরিমানা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নদী পাড়ের বাসিন্দারা জানান, বালু বিক্রি টাকার ভাগ অনেকেই পাচ্ছে। সেজন্য চিহ্নিত বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বালু উত্তোলনের কারণে নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় গত এক বছরে নদী ভাঙনে অসংখ্য বসতবাড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দিরসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
বেড়ার নটাখোলায় অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার থেকে যমুনা নদী মাত্র ১৫০ মিটার দূর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এই টাওয়ার এখন ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাবনা থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন ও রেলস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। এদিকে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় নদী স্টেশনের দিকে সড়ে আসছে।
নটাখোলা, কাজীরহাট ঘাট হয়ে ভাটিতে ঢালারচরে যমুনা নদী থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু তোলা হচ্ছে। এখানে একাধিক ভলগেট, ড্রেজার ও বোমামেশিনের সাহায্যে বালু তুলে বড় বড় নৌকা ও কার্গোজাহাজ বোঝাই করে নগরবাড়ীর অদূরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে দীর্ঘ পাইপের সাহায্যে সেই বালু এনে রাখা হচ্ছে নগরবাড়ী ঘাটের পাশে খোলা জায়গায়। সেখান থেকে ট্রাক বোঝাই করে বালু পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনৈক বালু ব্যবসায়ী জানান, বেড়া উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ট্রাক বালু বিক্রি করা হয়।
বালু উত্তোলনের ফলে ভূ-অভ্যন্তরের অবকাঠামো কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে- এই প্রশ্নের জবাবে পাবনার পরিবেশবিদ আবুল কালাম আজাদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ভূগর্ভের সাজানো স্তর এখন আর আগের মতো নেই। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর ভূস্তরের কাঠামো ভেঙে এলোমেলো হয়ে যায়। এতে নদ-নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। জীববৈচিত্র্য ও জলজপ্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। রিখটার স্কেলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বহু এলাকা দেবে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম জানান, ভাঙন প্রতিরক্ষা কাজের পাশ দিয়ে যমুনা ও পদ্মা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর যেকোনো পয়েন্ট থেকে বালু তোলায় প্রতিরক্ষা কাজে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। নদীর যে স্থান থেকে বালু তোলা হয় তার চারপাশে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রশাসনকে এ ধরনের অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।



