ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। ৯০ এর দশকেও ভারতীয় সুতিপ্রিন্টের শাড়ির একচেটিয়া দাপট ছিল দেশের তাঁতশিল্পে। ওই সময় এ দেশের অসংখ্য তাঁতি অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতে না পেরে তাদের অনেকেই পেশা থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর শুরু হয় করোনা, তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এসবের বিরূপ প্রভাবে রঙ ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিদের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছিল। সেটিও ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি। বর্তমানে বাংলাদেশী শাড়ি লুঙ্গি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, আসাম ও অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক বাজার সৃষ্টি করেছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আগামী কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বিপুল পরিমাণ শাড়ি লুঙ্গি ও থ্রিপিস ভারতের বাজারে রফতানি হচ্ছে। ভারতের ব্যবসায়ীরা হাটে হাটে ঘুরে পছন্দের শাড়ি কিনে বৈধপথে নিয়ে যাচ্ছেন। গত রমজানের ঈদের পর থেকেই ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাপড় আমদানি করছেন। শুধু তাই নয়, ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে লুঙ্গি আমদানি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানিও করছেন।
ভারতীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পশ্চিমবঙ্গের বাজারে রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের তাঁতের সিল্ক জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, সুতি কাতান, রাজশাহী সিল্ক, বেনারশি, চোষা, শেড, স্বর্ণলতা শাড়ির বেশ কদর রয়েছে। কলকাতার কাপড় ব্যবসায়ী গোপালচন্দ্র সেন জানান, বাংলাদেশের কাপড় টেকশই ও উন্নত মানের। দামও তুলনামূলক কম। তাই ভারতীয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মহিলাদের কাছে বাংলাদেশের তাঁতের সুতি শাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি আরো জানান, পশ্চিমবাংলার উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ডেমরার জামদানি, ঢাকার মিরপুরের কাতান, বেনারশি, রাজশাহীর সিল্ক ও গরদ শাড়ি। মধ্যবিত্ত পরিবারে পছন্দের তালিকায় রয়েছে ঈশ্বরদীর কাতান, বেনারশি, টাঙ্গাইলের হাফসিল্ক জামদানি, নকশি, শাহাজাদপুরের স্বর্ণলতার চাহিদা ব্যাপক। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের পছন্দ টাঙ্গাইলের সুতি জামদানি, সুতি কাতান, চোষা ও শেড শাড়ি। উন্নতমান, টেকসই, রুচিশীল শাড়ি কম দামে পাওয়ায় মহিলারা বাংলাদেশী শাড়ি কেনার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
ভারতের পশ্চিমবাংলার উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, হুগলী, বর্ধমান, নদীয়া, মূর্শিদাবাদ, মালদহ, জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কুচবিহার, হাওড়া ও হুগলিসহ বিভিন্ন জেলার ছোট-বড় নামিদামী শপিংমল ও বিপণী বিতানে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্রান্ডের শাড়ি শোভা পাচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন পূজা-পার্বণে বাংলাদেশি শাড়ির বাজার জমে উঠে।
পশ্চিমবঙ্গের কাপড় ব্যবসায়ী বারাসাতের রায়হান আলম ও অনিল সাহা জানান, তারা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আতাইকুলা, শাহজাদপুরহাট, এনায়েতপুরহাট, করোটিয়াহাট, বাবুরহাট ও ডেমরাহাট থেকে প্রতিনিয়ত শাড়ি কিনছেন। প্রতি পিস শাড়ি দেড় হাজার টাকা থেকে ১৫-২০ হাজার টাকা দামেও শাড়ি কিনছেন তারা। বাংলাদেশের তাঁতিদের জামদানি নকশা, সেড ও থান কাপড়ের পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ ভারতের তরুণ তরুণীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ভারতীর ব্যবসায়ীরা জামদানি থ্রিপিস ২০০০-৩০০০ হাজার এবং চেক থ্রিপিস ৭০০-৯০০ টাকা দামে কিনে সড়কপথে পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন শপিংমল, বিপণীবিতানে সরবরাহ করছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান। আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন নিয়ে আসায় দেশীয় তাঁত শিল্প প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ডিজাইনারা তাদের কাজকর্মে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসায় এ শিল্প সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়োপযোগী করে বুনোন শৈলী নান্দনিক মনোমুগ্ধকর নানা নকশা আর রঙের মাধুর্য দিয়ে তৈরি এ অঞ্চলের তাঁতের কাপড় ভারতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে বিবিআনা, রঙ, কে ক্রাফট ও নগরদোলাসহ দেশের শীর্ষ বুটিক হাউজের কাপড় ও এখন সিরাজগঞ্জ পাবনা অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে। বুটিক হাউজের নিজস্ব ডিজাইনে রেশম সুতা, খাদি, নয়েল, ডুপিয়ান ও এন্ডি সুতা ব্যবহার করে তাতে প্যালেস ও জরি মিশ্রিত করে তৈরি করা হচ্ছে কাপড়। এখানকার তাঁতপল্লীতে বুটিক হাউজের ওড়না থান কাপড় ও এন্ডি থান কাপড়ের ফ্রেবিক্স তৈরি করা হচ্ছে।
বেনারসি পল্লীর তাঁত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওকিল হোসেন জানান, রং সুতার দাম কমানো ও ভারতীয় শাড়ি আমদানি বন্ধ হলে দেশের তাঁতিরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড পাবনা বেসিক সেন্টারের দায়িত্বরত লিয়াজোঁ অফিসার খন্দকার ওবাইদুর রহমান জিলানী জানান, করোনার ক্ষতি পোষাতে তাঁতিদের প্রণোদনা ও ঋণের ব্যবস্থা করায় তাঁতিরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। পাবনা জেলা তাঁতি সমবায় সমিতির সভাপতি কামরুল আনান রিপন জানান. সরকার বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে তাঁতিদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে বন্ধ হওয়া তাঁতগুলো আবার সচল করা সম্ভব হবে।