সংসদীয় আসন হিসেবে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আসন থেকে যে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হন, সাধারণ ভোটারদের ধারণা সেই দলই সরকার গঠন করবে। স্বাধীনতার পর থেকে বরাবরই এমনটি দেখে আসছেন এখানকার ভোটাররা। সারা বিশ্বে পরিচিত মানবতার শহর হিসেবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় উখিয়া-টেকনাফের এই সংসদীয় আসনটির আলাদা কদর রয়েছে। সেই সাথে বদনামও আছে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক পাচারের কারণে। বাংলাদেশে ইয়াবা আসে মিয়ানমার সীমান্ত পথে টেকনাফ হয়ে। ইয়াবার গডফাদাররা সবসময়ই থাকে প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি উখিয়া-টেকনাফের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা বেড়েছে। আশির দশকে উখিয়া-টেকনাফের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ছিলেন এজাহার মিয়া কোম্পানি। এজাহার মিয়ার রাজনীতির শুরু জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। পরে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। একসময় এমন কথাও প্রচলিত ছিল, এজাহার কোম্পানি যেদিকে যান, সেদিকেই ঘোরে এ অঞ্চলের রাজনীতির চাকা। এই এজাহার মিয়ার দেখানো পথেই হাঁটা শুরু করেন তার বড় ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি। যিনি নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে শীর্ষ সংবাদ হয়েছেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে উখিয়া-টেকনাফ আসনে আব্দুর রহমান বদি বিএনপির মনোনয়ন পান। কিন্তু নির্বাচনের কিছু দিন আগে তার মনোনয়ন কেড়ে নেয়া হয়। এতে বেঁকে বসেন বদি। যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ১৯৯৮ সালের দিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সহায়তায় তিনি টেকনাফ পৌরসসভার প্রশাসক হন। ২০০২ সালে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। এরপর থেকেই এমপি আব্দুর রহমান বদি হয়ে ওঠেন উখিয়া-টেকনাফের রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তার কথায় চলে সব। তার ইচ্ছাতেই চলে এ এলাকার অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য। তার অঙ্গুলি হেলনেই নির্বাচিত হন বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।
পরবর্তীতে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় আব্দুর রহমান বদিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন না পেলেও তার স্ত্রী শাহিন আক্তার নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। ফলে স্ত্রীর বদৌলতে এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে আব্দুর রহমান বদির অংশগ্রহণ ও জনসম্পৃক্ততা সমানভাবেই চলছে। এদিকে তার শ্যালক উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজা পালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির কবির চৌধুরী আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আগামীতে জাহাঙ্গির কবির চৌধুরী, নাকি বদির স্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য শাহিন আক্তার অথবা বদি নিজেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন-এটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, এরই মধ্যে আওয়ামী লীগে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এক পক্ষ বদি গ্রুপ, অন্য পক্ষ রাজা শাহ আলমের ৬ জনের এক গ্রুপ এবং কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুরের গ্রুপ। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বদির চাচা শ্বশুর উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী, তার স্ত্রী মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী নিগার সোলতানা ও বদির আরেক চাচা শ্বশুর মুক্তিযোদ্ধা জাফর আলম চৌধুরী। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী আরো যারা জোর লবিং করছেন তারা হলেন- কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজা শাহ আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কবি আদিল উদ্দিন চৌধুরী, কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুর, টেকনাফের নুরুল বশর, মাহাবুব মোর্শেদ ও সাইফুদ্দিন খালেদসহ প্রায় এক ডজন নেতা।
এদিকে বিএনপিতে ক্লিন ইমেজের বরেণ্য রাজনীতিবিদ কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীরও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে এলাকায়। তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। বিএনপি যুগপৎ আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কক্সবাজার-৪ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে বরাবরই শাহজাহান চৌধুরীর অবস্থানই সবার শীর্ষে।
অপর দিকে উখিয়া-টেকনাফে জামায়াতে ইসলামীর বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। তারা দলীয় কার্যক্রমে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষের কাছে জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়েছে। এই আসন থেকে কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমির ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যেই জানান দিয়েছেন। তবে এখানে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম তেমন একটা চোখে পড়ে না। সাধারণ ভোটাররা বলেন, সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। এটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। ইতোমধ্যে কক্সবাজার-৪ আসনকে ঘিরে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। সাধারণ মানুষ ও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনায় বেরিয়ে আসছে কোন দল থেকে কে প্রার্থী হচ্ছেন। কাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া এ নির্বাচনে যারা প্রার্থী হবেন তাদের মধ্যেও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি থেকে ডজন খানেক নেতা নির্বাচনী মাঠ এখন চষে বেড়াচ্ছেন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ও সরকার গঠন ব্যবস্থা দেখে সংসদীয় ২৯৭ নম্বর আসন হিসেবে কক্সবাজার-৪ এর এই আসনটিকে ভাগ্যবান আসন হিসেবেই চিহ্নিত করেন ভোটাররা। কেননা প্রতিবারই যে দল সরকার গঠন করে, উখিয়া-টেকনাফ আসন থেকে ওই দলের টিকিটপ্রাপ্ত নেতাই এমপি নির্বাচিত হন এখানে। এ কারণে এই আসনের ভোটারদের মধ্যে একটি বিশ্বাস কাজ করে যে, এটি হচ্ছে সরকার গঠনের জন্য লক্ষ্মী আসন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী নির্বাচিত হন। আর সে দু’বারই বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী এবং ২০০৮ সালে ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুর রহমান বদি এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে এমপি নির্বাচিত হন বদির সহধর্মিণী শাহিন আক্তার বদি। তখন উল্লেখিত সময়ে চারবারই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন রয়েছে। সে হিসেবে কক্সবাজারের এ আসনকে (উখিয়া-টেকনাফ) ভাগ্যবান আসনই বলা যায়।