জাতীয় পাটি (জেপি) কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থবিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম বাহাদুর হত্যার মূলপরিকল্পনাকারী চাদনি ও তার মা মমতা বেগমসহ তিনজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে রাজধানীর শেরে-বাংলা-নগর থানা পুলিশ।
শনিবার (২২ জুলাই) রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওই থানার এসআই আক্তারুজ্জামান নিশ্চিত করেন। সেইসাথে কিলার নয়নসহ তার অন্য সহযোগিদের গ্রেফতারের জোর চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান। এর আগে (১৬ জুলাই) নিহতের ছোট ভাই আব্দুল করিম খলিফা শেরে-বাংলা-নগর থানায় অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
সালাম বাহাদুরের বাড়ি পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকান্দি গ্রামে। তিনি ঢাকার ধানমন্ডির ২৭ নাম্বার রোডের ৩৫/এ বাসায় স্বপরিবারে বসবাস করতেন। রাজনীতির পাশাপাশি সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঠিকাদার ও গার্মেন্টস এক্সসোরিজ ব্যবসা করতেন তিনি।
পুলিশ জানায়, ইতোমধ্যেই চাঞ্চল্যকর সালাম হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। মৃত্যুর আগে তাকে কথিত বান্ধবী চাদনি ও তার সহযোগিরা মধ্যযোগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতন চালায়। এ ঘটনার মূলহোতা মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের গাজিন্দা বড় পাড়া গ্রামের মৃত ঈদু চোরার ছেলে আকাশ আহাম্মেদ নয়ন (৪৫)।তিনি সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
সূত্র জানায়, গত ১৫ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের গাজিন্দা গ্রামে চাদনির বাড়িতে সালাম বাহাদুরকে আটকিয়ে চালানো হয় নির্যাতন। চাদনির পৈত্রিক নিবাস বরিশাল জেলায়। প্রায় চার বছর আগে এখানে জমি কিনে বাড়ি করেন। থাকতেন মা, বাবা ও ভাইবোন নিয়ে। এরই মধ্যে একাধিক বিয়ে করে বিভিন্ন পুরুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে হাতিয়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা পয়সা। আর এসব অপকর্মের শেল্টার দিয়ে ভাগ নিতেন আকাশ আহাম্মেদ নয়ন।
সূত্র আরো জানায়, জেপি নেতা সালাম হত্যার আগে চাদনি টোপ দিয়ে তাকে গাজিন্দা গ্রামে এনে ঘরের ভেতরে আটক করেন। তার সাথে নয়ন ও তার সহযোগী হজা ডাকাত, সুলতান, শরিফ, জসিম, রুবেল ও পিন্টু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দফায় দফায় নির্যাতন চালায়। সালামের কাছ থেকে নেয়া হয় সাত লাখ টাকার চেক ও সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর। এর মধ্যে বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের পল্লী চিকিৎসক দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করানো হয়। এরপর তার হাত ভেঙে দেয় তারা। টানা নির্যাতনের ফলে সালাম পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেন তারা। চাদনিসহ আরো দু'জন আহত সালামকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। পথেই মৃত্যু হয় সালামের। একপর্যায়ে চাদনি ও তার সহযোগীরা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে লাশ ফেলে পালিয়ে যায়।
গ্রামবাসীদের দাবি, ডাক নাম নয়ন হলেও তার সাথে আকাশ আহম্মেদ যোগ করে গড়ে তুলে সন্ত্রাসী বাহিনী। ইতোপূর্বে স্থানীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে তার স্বামী ডা. মঈন আহম্মেদকে মারধর ও গাড়ি ভাংচুর করে নয়ন ও তার সহযোগীরা। ডা. মঈন থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। এছাড়াও তার ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন বাড়ি ছাড়া ছিলেন প্রতিবেশী জাহিদুল ইসলাম ছাহিমের পরিবার। এরপর থেকেই নয়নের অপকর্মের ধারাবাহিকতা বেড়েই চলছে।
ধল্লা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, নয়নকে উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক পদ দেয়ার কথা শুনে ইতোপূর্বে আমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভা বর্জন করেছি। নয়নের এমন অপকর্মের দায়ভার আওয়ামী লীগ নিতে পারে না বলেও জানান তিনি।
সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: শহিদুর রহমান শহিদ বলেন, উপজেলা কমিটিতে খসড়া তালিকায় তার নাম থাকলেও চুড়ান্ত তালিকায় নেই। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ভার দল নিতে পারে না বলেও জানান।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ বেগমের কাছে নয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুদে বার্তায় জানান, 'আমি তো জানি ধল্লার কিছু নামিদামি সাংবাদিকরা এদেরকে দিয়ে জমি দখল, বিদেশ ফেরতসহ অন্য এলাকা থেকে কোনো লোক এলে চান্দাবাজি করিয়ে ভাগ করে নেয়াটাই এখন প্রধান আয়ের উৎস।'



