নওগাঁর রাণীনগরে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মজিদ আকন্দের বিরুদ্ধে তিন লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে দ্বিতীয় স্ত্রীকে বেদম মারপিট ও নির্যতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
৫ জুলাই উপজেলার একডালা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্ত প্রভাবশালী আব্দুল মজিদ আকন্দ একডালা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় গেলে মজিদ প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি পুলিশ। বাধ্য হয়ে ১৬ জুলাই নওগাঁ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগী ওই গ্রামের মরহুম-মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে দুই সন্তানের মা অসহায় শিউলী বিবি (৪৭)।
অভিযোগে জানা গেছে, শিউলি বিবি প্রথম স্বামী ভালো না হওয়ার কারণে প্রায় পাঁচবছর আগে স্বামীকে তালাক দিয়ে দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে বাবার বাড়ি এসে বসবাস করতেন। জীবিকার তাগিদে বাড়িতেই কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে আসছিলেন তিনি। সেলাইয়ের কাজ আরো বেশি হওয়ার আশায় শিউলি রাজাপুর গ্রামের মোড়ে ফুফাতো ভাই আব্দুল মজিদ আকন্দের মার্কেটে গত বছর একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতে থাকেন। কিছুদিন পর স্থানীয় কিছু বখাটে শিউলিকে কু-প্রস্তাব দেয়া শুরু করে। এরপর শিউলি বিষয়টি আব্দুল মজিদ আকন্দকে জানালে শিউলিকে বিয়ে করে মাথার ওপর ছাতা হওয়ার বিভিন্ন প্রলোভন দেয় মজিদ আকন্দ।
শিউলি বিবি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখে মুসলিম শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এক লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মজিদ আকন্দ শিউলিকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর মজিদ আকন্দ নানা কৌশলে তার সঞ্চয় করা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তিতে মজিদ আকন্দ তার প্রথম স্ত্রী, মেয়ে, জামাই, ভাই ও ভাতিজাদের কুপরামর্শে তার কাছ থেকে আরো তিন লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে দাবি করেন। এরপর তার দাবি করা টাকা শিউলি দিতে না চাইলে মজিদ আকন্দ তার সাথে আর সংসার করবে না বলে ৫ জুলাই বিকেলে মজিদ আকন্দসহ অন্যরা সবাই মিলে শিউলি বিবিকে মারপিট করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
তিনি আরো বলেন, ওই ঘটনার পর ৯ জুলাই মজিদ আকন্দ গোপনে তালাক নামা আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তালাক নয়, সংসার করার জন্য আমিসহ মা ও অন্যরা মজিদ আকন্দের বাড়িতে যাই। পরবির্ততে ১২ জুলাই আমার বাবার বাড়িতে সন্ধ্যায় মজিদ আকন্দসহ অন্যদের নিয়ে বসলে যৌতুক ছাড়া মজিদ আকন্দ আমার সাথে সংসার করার কথা বলে শিউলির স্বজনরা। কিন্তু মজিদ আকন্দ তিন লাখ টাকা ছাড়া শিউলিকে নিয়ে সংসার করবে না বলে সিদ্ধান্ত জানালে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আবার মজিদ আকন্দসহ অন্যরা লাঠি দিয়ে শিউলি বিবিকে বেদমভাবে মারপিট করে।
এতে করে শিউলি বিবি গুরুতর আহত হলে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। শিউলি বিবি একটু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে চলতি মাসের ১৫ জুলাই বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়। ওই দিন বিকেলে থানায় মামলা করতে গেলে থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ না করায় পরের দিন ১৬ জুলাই আদালতের মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান পাওয়ার আশায় মজিদ আকন্দকে প্রধান করে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন শিউলি বিবি।
শিউলি বিবি আরো জানান, দুই মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর থেকে তিনি এই পৃথিবীতে খুবই অসহায়। মজিদ আকন্দ এতোই প্রভাবশালী যে তার ভয়ে গ্রামের কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারে না। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা মজিদ আকন্দের অবৈধ তালাক মানে না। অনেক প্রলোভন দিয়ে মজিদ আকন্দ তাকে বিয়ে করেছেন। তাকে বিয়ে করার কারণে চলতি বছর মজিদ আকন্দ হজ পর্যন্ত করতে যাননি। তার অর্থসহ সবকিছুই মজিদ আকন্দ লুট করে নিয়েছে। আর এখন এসে কোনো কারণ ছাড়াই মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে বলছে যে তার সাথে আর ঘর সংসার করবে না। শিউলি এসবের কোনো কিছুই মানেন না। তিনি মজিদ আকন্দের সাথে ঘর সংসার করতে চান। শিউলি বিবি আশাবাদি যে মহামান্য আদালত তদন্ত সাপেক্ষে তাকে মজিদ আকন্দের সাথে সংসার করার সেই সুযোগ করে দিবেন।
শিউলি বিবির মা জিন্নাতুন বেওয়া বলেন, মজিদ আকন্দ বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করে। পরবর্তিতে মজিদ আকন্দ নিয়ম মাফিক আমাদের সাক্ষী করে কাজীর মাধ্যমে আমার মেয়েকে বিয়ে করেছে। বিনা কারণে মজিদ আকন্দ আমার মেয়েকে মারপিট করেছে। আমি এর বিচার চাই। আমরা গোপনে দেয়া মজিদ আকন্দের তালাক মানি না। যৌতুক ছাড়াই আমার মেয়ে মজিদ আকন্দের ঘর সংসার করবে এই আশায় আদালতের আশ্রয় আমরা নিয়েছি। আশা রাখি আদালত আমাদেরকে সুষ্ঠু বিচার করে দিবেন।
এই বিষয়ে আব্দুল মজিদ আকন্দ মুঠোফোনে জানান, যৌতুকের দাবিতে শিউলিকে মারপিট করার যে অভিযোগ তা সম্পন্ন মিথ্যে ও বানোয়াট। আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু নানা কারণে আমি সম্প্রতি তাকে তালাক দিয়েছি। সে এখন আর আমার স্ত্রী নয়। আমি তার সাথে আর ঘর সংসার করতে চাই না।
একডালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান আলী মুঠোফোনে জানান, এই বিষয়টি আমি লোকমুখে শুনেছিমাত্র। এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে লিখিত কিংবা মৌখিকভাবে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



